সর্বশেষ সংবাদ :

গণহত্যা দিবস ও নতুন প্রজন্ম

আনন্দ কুমার সাহা:
২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুধুমাত্র ঢাকাতে একরাতে ২০ হাজার ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করা হয়। সারাদেশে প্রায় ১ লাখ মানুষকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যা করে। ২৫শে মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে শুরু হয় পৃথিবীর নৃশংসতম গণহত্যা। কামানের গোলা, মর্টারের শেল- আর মেশিনগানের ভয়াল গর্জনে রাত ১২টার পর ঢাকা শহরে ঘুমন্ত মানুষের উপর নেমে আসে ইতিহাসের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নিরাপত্তার জন্য এক প্লাটুন সৈন্য রেখে বাকি সেনাবাহিনী বিভিন্ন গন্তব্যের দিকে রাত সাড়ে ১১টায় যাত্রা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর, পিলখানা-রাজেন্দ্রপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরী এবং ৩২ নম্বর রোডে একযোগে হামলা চালানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ৩২ নং থেকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে জানানো হয় ‘বিগ বার্ড ইন দি কেজ, আদারস আর নট ইন দি নেষ্ট।’ পরিকল্পনা ছিলো- আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করার।

জাতীয় সংসদে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস বিষয়ে ৫৬ জন এম.পি আলোচনায় অংশগ্রহণ করে এবং সংসদনেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের জন্য আহ্বান জানান এবং মহান জাতীয় সংসদ ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, যুবসমাজ বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে স্বাধীন করলো। যে ছাত্ররা গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সেই শাণিত চেতনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আজ সকালে (২৫ মার্চ) আমরা ক’জন সহকর্মী হাঁটতে যেয়ে দেখা গেল প্যারিস রোডে একটি বিভাগের শিক্ষকসহ শিক্ষার্থীরা ফটোসেশনে ব্যস্ত। পাশেই ২টি বাস দাঁড়ানো, পিকনিকে যাওয়ার জন্য কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাম্পাস ছেড়ে যাবে। একটু এগিয়ে লাইব্রেরীর পাশে অর্থাৎ চতুর্থ সায়েন্স বিভাগের দক্ষিণ গেটে ৩টি বাস দাঁড়ানো। একটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা পিকনিকে পাহাড়পুর যাবে। রবীন্দ্র ভবনের সামনে বেশ বড় একটি প্যান্ডেল। প্যান্ডেলের পাশেই ১০টি খাসি জবাই করা হচ্ছে। ৪-৫ জন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তদারকির দায়িত্ব পালন করছেন। বাণিজ্য অনুষদের কোন একটি বিভাগ ৯৩-৯৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। কিছুদূর যেতেই জানা গেল ৯৩-৯৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন তাঁদের উদ্যোগে আজ পুনর্মিলনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পশ্চিমপাড়ায় শিক্ষকদের আবাসস্থলের কাছে ২টি বিভাগের কোন একটি বর্ষের শিক্ষার্থীরা পিকনিকের আয়োজন করেছে। স্টেডিয়ামের সামনে চুয়াডাঙ্গা কল্যাণ সমিতি এবং বীরগঞ্জ কল্যাণ সমিতির বার্ষিকসভা এবং প্রীতিভোজের আয়োজন। প্রীতিভোজ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একই বধ্যভূমির পাশে বেশ কয়েকটি বিভাগের বার্ষিক বনভোজনের আয়োজন। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলে ’৯২-ব্যাচের পূণর্মিলনী অনুষ্ঠান। কিন্তু আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় আছি তাদের কোনভাবেই ২৫ মার্চে বনভোজনের আয়োজনে উৎসাহ দেওয়া প্রত্যাশিত নয়।

আজ সকালেই বন্ধু সহকর্মী জানালেন- গতকাল শেষ সেমিষ্টারের শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিলো- তোমার বাসা নওগাঁ- তোমার এলাকার মন্ত্রী মহোদয়ের নাম কি বলোতো? আর একজন পঞ্চগড়ের ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হলো তোমার এলাকার একজন মন্ত্রীর নাম বলোতো- কেও বলতে পারলো না- কারণ কি? বর্তমান প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী- প্রাইভেট- কোচিং ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত, অন্য কিছু ভাবার সময় নেই। একজন শিক্ষক অভিভাবক বলছিলেন- গত ৭-৮ বছর তাঁকে দিনে ৫ ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হয়। মেয়েকে এক টিউটর থেকে অন্য টিউটরের কাছে যেতে অধিকাংশ সময় তাঁকে রাস্তায় থাকতে হয়। একথাও বলছিলেন এক বিষয়ের জন্য অনেকসময় ২ জন শিক্ষকের কাছে যেতে হয়।

২৫ মার্চ, ২৬ মার্চ, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট, ৩ নভেম্বর, ১৬ ডিসেম্বর দিবসগুলো কি? তা জানার আগ্রহ মোটেই নেই। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। যাহোক যে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম- অত্যন্ত খারাপ বোধ করছিলাম- আজ ভয়াল ২৫ মার্চ কালরাত্রী ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম একটি দিন। ১৯৭১ সালে এই দিনে সারাদেশে এক লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়েছিলো- যা গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়- সেখানে বিনম্রচিত্তে শ্রদ্ধা করা উচিত। ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২৫ মার্চ, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট, ৩রা নভেম্বর, ১৪ ডিসেম্বর আমাদের এমন কোন কিছু করা উচিত নয়- যাতে করে শহীদদের অবমাননা করা হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঈর্ষণীয়। মাথাপিছু আয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শতভাগ বিদ্যুতায়ন সবদিক থেকে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে- কিন্তু মানসিকতার তেমন উন্নয়ন ঘটেনি বলে আমার মনে হয়। আশা করবো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উল্লিখিত দিনগুলিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এমন কোন কিছু করবে না যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। আশা রাখি এ বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খেয়াল রাখবেন।

লেখক: ড. আনন্দ কুমার সাহা
অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও
সাবেক উপ-উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২২ | সময়: ১:৪৩ অপরাহ্ণ | Daily Sunshine