সর্বশেষ সংবাদ :

কেদ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা এখন কে কোথায়

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্ব থেকে বর্তমান পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের পরবর্তী অবস্থান পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, শুরুর দিকে যেসব ছাত্রনেতা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের বেশিরভাগই পরবর্তী সময়ে নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির ধারায় ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এদের কয়েকজন ঘোরতর বঙ্গবন্ধুবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

প্রথম দিকের নেতারা বেশি কক্ষচ্যুত হলেও ছাত্রলীগের সর্বশেষ ৯টি কমিটির কেউ ভিন্ন রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। তবে তারা আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় অনেকটা নিষ্ক্রিয় আছেন। কয়েকজন অবশ্য কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এদের মধ্যে ১৯৯৪-৯৮ কমিটির সভাপতি একেএম এনামুল হক শামীম আওয়ামী লীগের আগের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক থাকলেও বর্তমান কমিটিতে নেই। সরকার দলীয় এই সংসদ সদস্য বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অবশ্য সম্মেলনের মাধ্যমে বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে সংগঠনের পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে আট জন বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অবশ্য এদের মধ্যে সাত জন আওয়ামী লীগ থেকে এবং একজন ভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। সিনিয়রদের মধ্যে ১৯৬৯-৭০ মেয়াদে সভাপতির দায়িত্বে থাকা তোফায়েল আহমেদ এবং জুনিয়রদের মধ্যে ২০০২-০৬ মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বর্তমান সংসদের সদস্য হয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ থেকে ওবায়দুল কাদের, শাহে আলম, অসীম কুমার উকিল, ইকবালুর রহিম  ও এনামুল হক শামীম বর্তমান সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এদিকে ১৯৮৬-৮৮ মেয়াদের সভাপতি সুলতান মুহম্মদ মনসুর আহমেদ এমপি হয়েছেন গণফোরাম থেকে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে তিনি বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন।

ছাত্রলীগের প্রথম কমিটির আহ্বায়ক নঈম উদ্দিন আহমদ শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘটে সমর্থন করায় বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের সঙ্গে নঈম উদ্দিনও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শাস্তির মুখোমুখি হন। কিন্তু নঈম উদ্দিন জরিমানা ও বন্ড সই দিয়ে ছাত্রত্ব ফেরত নিলে সংগঠনের স্বার্থ পরিপন্থী কাজের অভিযোগে ছাত্রলীগের আহ্বায়কের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরে অবশ্য যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি।

ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি দবিরুল ইসলামও ছাত্র রাজনীতি শেষ করার পর ৫৪’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন। তবে ‍যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষ ত্যাগ করে আবু হোসেনের কৃষক শ্রমিক পার্টির সরকারের প্রতিমন্ত্রী হন। যার কারণে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হন। একই কারণে বহিষ্কার হন ছাত্রলীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ও যুক্তফ্রন্টের এমএলএ খালেক নেওয়াজ খান। যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার পর তিনি শেরেবাংলার পার্লামেন্টারি সচিবের পদ গ্রহণ করেন। খালেক নেওয়াজ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, আমার মনোনীত প্রার্থী খালেক নেওয়াজ প্রতিষ্ঠানের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশি করেছিল।’

১৯৫৩-৫৭ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আউয়ালকে বঙ্গবন্ধু আদমজী জুটমিলের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব দেন। তিনি দুর্নীতির দায়ে বরখাস্তও হন। তিনি জাসদে যোগ দিয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ’৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে জামানত হারান।

১৯৬০-৬৩ সালে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে থাকা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সত্তর ও ’৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু তাকে প্রথম সংসদের চিফ হুইপ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি মোশতাক সরকারের প্রতিমন্ত্রী এবং তার সঙ্গে মিলে ডেমোক্র্যাটিক লীগ গঠন করেন। জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শাহ মোয়াজ্জেম পরবর্তী সময়ে জেনারেল এরশাদের দলে যোগ দিয়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব হওয়া শাহ মোয়াজ্জেম এরশাদকে ত্যাগ করে পাল্টা জাতীয় পার্টি গঠন করেন এবং সর্বশেষ বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।

১৯৬৩-৬৫ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি কেএম ওবায়দুর রহমান বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি মোশতাক সরকারের প্রতিমন্ত্রী হন। জেনারেল জিয়ার আমলে মন্ত্রী এবং পরে খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপির মহাসচিব পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। ‘জনতা দল’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলেও ১৯৯৬ সালে আবারও বিএনপিতে ফেরত আসেন। প্রয়াত এই নেতার মেয়ে বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত।  কে এম ওবায়দুরের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের  সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খান স্বাধীনতা পর জাসদ গঠনে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেন। কথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা সিরাজুল আলম খানের অনুপ্রেরণায় শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের একাংশ পাল্টা ছাত্রলীগ গঠন করে। যারা জাসদ ছাত্রলীগ নামে পরিচিতি লাভ করে। সিরাজুল আলম খান পরবর্তী সময়ে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। বর্তমানে তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি নির্বাসনে রয়েছেন।

১৯৬৭-৬৮ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে দূরে সরে পড়েন স্বাধীনতার আগেই। জিয়ার শাসনামলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হলেও লাইমলাইটে আসতে পারেননি। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশের ‘গ্রিন পার্টি’ গঠন করেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি কিং পার্টি খ্যাত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি) গঠন করে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনও পান।

১৯৬৮-৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুর রউফ। তিনি সভাপতির পদ থেকে একপর্যায়ে বহিষ্কারও হন। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের এমপি হন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর খুনি মোশতাকের আমলে সংসদে চিফ হুইপ হন। অবশ্য তার পরিবারের দাবি—মোশতাক তাকে চিফ হুইপ করলেও তিনি ওই পদের দায়িত্ব নেননি। পরে  আওয়ামী লীগে ফিরে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামে যুক্ত হন। তিনি গণফোরামের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য থাকা অবস্থায় ২০১১ সালে মারা যান।

১৯৬৯-৭০ মেয়াদে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব স্বাধীনতার পর সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেন এবং ছাত্রলীগের পাল্টা নেতৃত্ব সৃষ্টি করেন। তিনি জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ১৯৮৮ সালে এরশাদের ভোটারবিহীন নির্বাচনে গিয়ে বিরোধী দলের নেতা হন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার ঐকমত্যের সরকারের মন্ত্রী হন। বর্তমানে নিজের প্রতিষ্ঠিত জেএসডি নিয়ে তিনি সরকারবিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টে রয়েছেন।

১৯৭০-৭২ মেয়াদে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাকে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। তবে তিনি ছিলেন বাকশালবিরোধী। প্রথম সংসদের এমপি নূরে আলম বাকশালে যোগ না দিয়ে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগে ফিরে এসে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এরপর থেকে তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। তবে ‘সাবেক ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার ছেলে তাহজীব আলম সিদ্দিকী বর্তমানে আওয়ামী লীগের এমপি।

নূরে আলম সিদ্দিকীর সময়ে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাজাহান সিরাজ। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৬ মাসের মাথায় ছাত্রলীগে ভাঙন দেখা দেয়। এ সময় ‘মুজিববাদী’ হিসেবে পরিচিত অংশের নেতৃত্ব দেন নূরে আলম সিদ্দিকী। আর শাজাহান সিরাজের অংশটি ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে পরিচিত হয়। এই অংশটি পরবর্তী সময়ে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ নামে আত্মপ্রকাশ করে। শাজাহান সিরাজ জাসদের টিকিটে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্য হন।

১৯৭২-৭৩ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি হন শেখ শহীদুল ইসলাম। শেখ শহীদ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। পরে জেনারেল এরশাদের মন্ত্রী হন। বর্তমানে তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপির মহাসচিব।

১৯৭৩-৭৪ মেয়াদে ছাত্রলীগের সম্মেলনে নির্বাচিত সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী এরশাদের জাতীয় পার্টির চিফ হুইপ ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে বিএনপির নেতা। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান সেভেন মার্ডারের দায়ে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হন এবং ১৪ বছর সাজা লাভ করেন। জেনারেল জিয়ার আমলে মুক্তি পেয়ে ‘জাগপা’ নামে দল গঠন করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তার দল নিয়ে বিএনপি জোটে ছিলেন।

১৯৮৫-৮৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের পর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে তিনিই প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন। এর আগে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে গণফোরামের মনোনয়ন পেলে ঐক্যফ্রন্ট থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৮৮-৯২ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন হাবিবুর রহমান হাবিব। পরে ছাত্রলীগের রাজনীতি ছেড়ে যোগ দেন বিএনপিতে। তিনি বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা।

এদিকে ছাত্রলীগের সভাপতি (১৯৫৭-৬০) রফিকউল্লাহ চৌধুরী ছাত্রজীবন শেষ করে সিএসপি অফিসার হন, সভাপতি (১৯৫২-৫৩) কামরুজ্জমান অধ্যাপনা, একই মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক এম এ ওয়াদুদ সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। এছাড়া সভাপতি (১৯৬৫-৬৭) সৈয়দ মাজহারুল হক বাকী, সাধারণ সম্পাদক (৬৮-৬৯) খালেদ মোহাম্মদ আলী, সাধারণ সম্পাদক (১৯৭২-৭৩) এমএ রশিদসহ কয়েকজন নানা মান-অভিমানে প্রথম দিন থেকেই রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।


প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২২ | সময়: ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ | Daily Sunshine