Daily Sunshine

মা-বাবা থাকবে সন্তানের হৃদয়ে, বৃদ্ধাশ্রমে নয় !

Share

নুরুজ্জামান,বাঘা : মা হচ্ছেন একজন নারী, যিনি গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তানের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সকল দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ জন্য কোন-কিছুর সাথে মাকে তুলনা করা যায় না। মরমি শিল্পী ফকির আলমঙ্গীর তাঁর সু-মধুর কণ্ঠে গেয়েছেন “ মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম-পাপোষ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না…আমার মাগো।’’ অথচ এই মা’কে কালের বিবর্তনে অনেকেই কষ্ট দিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকার ভরণ পোষণ আইন চালু করলেও ব্যাপক প্রচার-প্রচারনা না থাকায় এটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকছে। এর ফলে অনেক বাবা-মাকে থাকতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।এমনটি মন্তব্য করেছেন সমাজের অভিজ্ঞ মহল।

খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, গত বছর সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অসুস্থ বৃদ্ধ মাকে মাজারে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে পাষন্ড সন্তানরা। এর আগে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে বৃদ্ধ বাবাকে ফেলে গেল তার ছেলে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৪ মার্চ রাজশাহীর বাঘা থানায় এক মা’তার সন্তানকে জমি লিখে না দেয়ার কারণে অত্যাচার আর নির্যাতন সইতে না পেরে থানায় হাজির হলেন। অত:পর ওসির মুখ থেকে পিতা-মাতা সম্পর্কে ভরণ পোষন আইন অবগত হয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন। কিন্তু বিধি বাম ! মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ঐ ছেলে হাজত থেকে জামিনে বাড়ি এসে ফের তার মাকে আবারও নানা ভাবে নির্যাতন শুরু করেন।

এসব ঘটনা শুনতে অবাস্তব মনে হলেও দিনের আলোর মতো সত্য। অবাক করা ব্যাপার হলো এসব ঘটনা ২০১৩ সালের পরবর্তীতে সংঘটিত। ২০১৩ সালের কথা কেন বলছি ? ২০১৩ সনেই বাংলাদেশ সরকার সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন- ২০১৩ প্রবর্তন করেন। এর আগে এ সম্পর্কিত কোনো বিধিবদ্ধ আইন ছিল না। ২০১৩ সালের পর এই আইন থাকা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে-অনেক পরিবারেই বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের কাছ থেকে ঠিকমত ভরণ-পোষণ তো পাচ্ছেই না, উপরোন্ত নিগৃহিত, নির্যাতিত এবং বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং আইন সম্পর্কে না জানা।

সুতারাং এটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, যেসব পিতা-মাতা সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাচ্ছেন না তারা এবং তাদের সন্তানরা এই আইন সম্পর্কে জানেন না। তাদের সন্তানরা এই আইন সম্পর্কে জানলে শাস্থিতির ভয়ে হলেও বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বিষয়ে সচেতন হতো। অখচ আইন না জানার কারনে অনেক পিতা মাতা সন্তানদের দ্ধারা ভরণ পোষন তো দুরের কথা, অত্যাচারিত হওয়ার পরেও থানা কিংবা আদালতে যাচ্ছেন না।

বাঘা থানায় ৪ঠা মার্চ ২০২১ দায়ের করা অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার চক বাউসা এলাকার প্রয়াত মোমিন উদ্দিনের স্ত্রী হাওয়া বেগম (৬৫) পনেরো বছর পুর্বে তার স্বামীকে হারান। স্বামীর মৃত্যুর সময় দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে সহ ২ একর পয়েন্ট ৭৩ শতাংশ জমি রেখে যান। পরবর্তীতে মেয়ে দুইটার বিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে এই জমি জোরপুর্বক ভোগ দখল করছেন তার বড় ছেলে মানিক । অভিযোগ রয়েছে , মানিক ঐ সম্পত্তি তার মায়ের নিকট হতে লিখে নিতে চান। কিন্তু মা’ রাজি না হওয়ায় তাঁকে মারপিট করে মানিক। নিরুপায় হয়ে তার মা’মেয়ে-জামাইকে সাথে করে থানায় এসে ভরণ পোষণ আইনের বিষয় অবগত হয়ে তার ছেলের নামে একটি মামলা দায়ের করেন।

সর্বশেষ এ থানায় ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ আরেকটি অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের ৭০ বছর বয়স্ক বিধবা নারী রুবিনা আক্তার। তিনি তার অভিযোগে জানান, তার তিনটা সন্তান রয়েছে। কিন্তু কেউ তাকে ভাত-কাপড় দেন না । বিধায় তিনি ভিক্ষা করে জীবন যাপন করেন। সম্প্রতি তার এক ছেলে মায়ের কাছে জমানো ১০ হাজার টাকা ধার নেন। আর এ টাকা চাইতে গেলে শুক্রবার(17 সেপ্টেম্বর)সকালে তার ছেলের বৌ মঞ্জুরা বেগম তার শাশুড়িকে বেধড়ক মারপিট করে। এ ঘটনায় তার চোখের নিচে কালশিরা(কালো দাগ) দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে সমাজের অভিজ্ঞ মহলের সাথে কথা বললে তারা বলেন, শুধু মানিক নয়, এ ধরনের ঘটনা হর-হামাশেই ঘটছে। তাঁদের মতে ,সরকারের এই আইন বিষয়ে এলাকায় মাইকিং করে হলেও ব্যাপক প্রচার প্রচারণার দরকার। তাহলে ছেলেদের দ্বারা জমি-জমা লিখে না দেওয়ার ঘটনায় নির্যাতন কিংবা নেশার টাকার জন্য মারখেয়ে কোন পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে না।

সার্বিক বিষয়ে বাঘা থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ(ওসি) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কোন সন্তান দ্বারা পিতা-মাতা নির্যাতনের ঘটনা আমাদের কাম্য নয়, এ থানায় দায়ের করা আগের মামলার সময় আমি এখানে ছিলাম না। তিনি বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে এই আইন থাকা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে অনেক পরিবারেই বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাচ্ছে না, উপরোন্ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হচ্ছে এ আইন সম্পর্কে না জানা। তিনি এ থানায় পাওয়া দ্বিতীয় অভিযোগটি তদন্ত পূর্বক আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

সেপ্টেম্বর ১৮
১৫:৩৫ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]