Daily Sunshine

আধুনিক জীবনের পূর্ণ সাদ পাওয়া যায় বাঘার আড়ানী গ্রামে

Share

নুরুজ্জামান,বাঘা : বাঘার সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামের নাম আড়ানী। এটি পদ্মা বিধৌত বড়ার নদীর পাড়ে অবস্থিত। প্রায় দু’শ বছর ধরে এ গ্রামটি শিক্ষা-দিক্ষা , খেলা-ধুলা, লোক চেতনা ,কৃষি ভাবনা হাট-বাজার ইত্যার্দি ঐতিহ্যে এগিয়ে। এখন এটি একটি পৌরসভা। উপজেলার সবচেয়ে পুরাতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই গ্রামে। তাও প্রায় ১৫৩ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত। এর আগে এখানে গড়ে উঠে নাটোরের মহারানী ভবানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত চতুষ পাঠি। অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী খ্যাপা বাবার আশ্রম টিও এখানেই অবস্থিত ।

উপজেলা সদর থেকে এই গ্রামের দুরত্ব ১২ কিলোমিটার। এই গ্রামে 153 বছর পুর্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আড়ানী মনোমোহিনী উচ্চ বিদ্যায়। এ ছাড়াও ব্রিটিশ আমল থেকে রয়েছে একটি রেলষ্ট্রেশান-সহ একটি পুরানো বাজার, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের এক মহাপুরুষ খ্যাপা বাবার আশ্রম টিও এখানেই অবস্থিত। সেই সাথে রয়েছে পদ্মা বিধৌত বড়াল নদী এবং দুটি প্রাচীন বৃক্ষ। আর এই বৃক্ষের নিচে ঘুমিয়ে আছেন জগত বিখ্যাত পীর-এ কামেল হযরত ইসমাইল শাহ্ বলখি। পরবর্তীতে এখানে আড়ানী ডিগ্রী কলেজ, আড়ানী এরশাদ আলী কলেজ, আড়ানী ফুলমননেছা বালিকা বিদ্যালয়, মা ও শিশু হাসপাতাল এবং আড়ানী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ গড়ে উঠে নানা মুখি সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয়রা জানান, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দলোনের নেতা শ্রী প্রভাষ চন্দ্র লাহেড়ী ও তার ভাই জিতেশ চন্দ্র লাহেড়ীর বাড়ি এই গ্রামে। এখানেই জন্মে ছিলেন অপরাজীয় কথা শিল্পী মনিন্দ্র মোহন শাহা। যার বিখ্যাত লেখা “তমাল তলার হাট’ । এ হাটটিও আড়ানী গ্রামের পাশে-ই অবস্থিত। এ ছাড়াও এই গ্রামে জন্মেছেন, প্রত্নতত্ব বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক শফিকুল ইসলাম মুকুট এবং সর্ব প্রথম বাঘা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন এই গ্রাম থেকে প্রয়াত সমাজ সেবক আব্দুল আজিজ। অপর একজন ব্যাক্তি বর্তমান সরকারের মাননীয় পররাষ্ট প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এখানে জন্ম না নিলেও মা-এবং নানা-নানির সূত্রে এই গ্রামকে ভালবেসে বর্তমানে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন। এ ছাড়াও এ গ্রাম থেকে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, এরমধ্যে বুলেটের আঘাতে একটি হাত হারানো আজাদ আলী অন্যতম। রয়েছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিক্ষাবিদ এবং দেশের প্রখ্যাত ব্যাক্তিগণ।

বলাবাহুল্য পার্শ্ববর্তী পুঠিয়া, চারঘাট-বাঘা, লালপুর ও বাড়াতি পাড়ার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন হয় আড়ানী গ্রামে। যার নাম করণ হয় পুঠিয়ার রানী মনোমোহিনীর নামে। এই প্রতিষ্ঠানের বয়স ১৫৩ অতিক্রম করলো। আর সে উপলক্ষে এখানে গত বছর দু’দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় নবীন-প্রবীনদের মিলন মেলা ও ১৫০ তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে যোগদেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, এমপি আব্দুল ওয়াদুদ দারা,এমপি আবুল কালাম আজাদ। এছাড়াও প্রবীন শিক্ষার্থী ওগুনীজন-সহ দেশবরেন্য শিল্পীরা।

এই গ্রামটি নদীতীরবর্তী ও রেলস্টেশনের ধারে হওয়ায় নানান ধরণের ব্যবসা বানিজ্যে সাফল্য লাভ করে আসছে সেই মধ্যযুগ থেকে। ফলে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী আড়ানী হাট ও বাজার। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলুদের ব্যবসা। এ ছাড়াও আম, গুড়, ধান, গম, মরিজ, আখ, পাট, আদা, আলু, বেগুন, কলা, পেঁপে,ঢেরস সহ সকল প্রকার ফসল উৎপাদন ও বানিজ্যের দিক থেকে সফলতা এনেছে এই আড়ানী।

এই গ্রামে রয়েছে খ্যাপা বাবার আশ্রম। সেই ইংরেজ শাসন আমলের কথা। হিন্দু সম্প্রদায়ের এক মহা পুরুষ তৎকলীন পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গী থানার হুকাহারা গ্রামের বাসিন্দা-শ্রী কৃষ্ণ প্রশন্ন বিশ্বাস। তিনি ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। যার শুভাগমন ঘটে উত্তর বঙ্গের রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার ৬ নং আড়ানী ইউনিয়নের বড়ালনদী বিধৌত শশ্মান ঘাটে। শ্রী কৃষ্ণ প্রশন্ন বিশ্বাস তার অলৌকিক ক্ষমতা বলে জয় করে নেন জনপ্রিয়তা। তার অলৌকিক ক্রিয়া কলাপে জনগণ আশ্চর্য হয়ে তাকে খ্যাপা বাবা নামে স্মরণ করত। জনশ্রুতি আছে, খ্যাপা বাবা মানব দেহের গলিত ঘা জিহ্বা দিয়ে চেটে ভালো করে দিত। এ জন্য তাকে খ্যাপা চাটা বাবা বলা হতো। খ্যাপাবাবা বাংলা ১৩১১ সালে এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। পুঠিয়ার রানী মনোমোহিনী তার অলৌকিক সংবাদে মুগ্ধ হয়ে তাকে তিনতলা বিশিষ্ট পিতলের রথ উপহার দেন। খ্যাপা চাটাবাবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতেন ইট দুর্গামন্দির ও শিব মন্দিরে ।

পাশেই রয়েছে জগত বিখ্যাত হযরত ইসমাইল শাহ্ বলখি’র মাজার। তিনি এসেছিলেন বলখ্ রাজ্য থেকে। উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম প্রচার। তার মাজারের পার্শ্বে রয়েছে দু’টি প্রাচীন বৃক্ষ। যার বয়স প্রায় ৩ শ বছর। এই দুটি বৃক্ষে মধ্যে একটি গাবগাছ ও অপরটি তেঁতুল গাছ। এর মধ্যে গাবগাছে ফুল হয়, কিন্তু ফল হয়না। এই মাজার ঘেষে গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় তলা বিশিষ্ট ওই এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদ। যেখানে হাজার-হাজার ধর্মপ্রান মানুষ নামজ আদায় করে থাকেন।

আড়ানী গ্রাম প্রসঙ্গে ওই এলাকার সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম জানান, উপজেলার মধ্যে আড়ানী শিক্ষা-দিক্ষায় সবচেয়ে পুরানো গ্রাম। আজ থেকে প্রায় দেড়’শ বছর পূর্বে এখানে পুঠিয়ার রানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে এটিকে সরকারী করণ করা হয়েছে । এর আগে এখানে নাটোরের মহারানী ভবানী গড়ে তুলে ছিলেন একখানা চতুষ পাঠি। যা এ অঞ্চলের শিক্ষা ক্ষেত্রের প্রাচীন নিদর্শন। বর্তমানে এটি পৌরসভা হওয়ায় এরমান আরো বহুআংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে এখানকার রাস্তাঘাট আলোক সজ্জায় সজ্জিত হওয়া সহ এখন নানাবিধ উন্নয় হচ্ছে।

এক কথায় কালের বিবর্তনে এই গ্রামের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জনসংখ্যা ও হাট-বাজারের আদিক্ষে এই গ্রামে এখন গড়ে উছেছে একটি আধুনিক পৌরসভা। যার নাম আড়ানী পৌর সভা। এটিও নতুন ঐতিহ্য ও ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে প্রাচীন বাজারটি আধুনিক চাকচিক্যময় নগর জীবনের সাদ পাইয়ে দিচ্ছে জনগণকে। স্থানীয়রা বলছেন, বিটিশ্র আমল থেকে এই গ্রামে আসা-যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অন্যান্য গ্রাম গুলোর তুলনায় অনেক ভাল। এরপর বর্তমান পৌর সভার আদলে মানুষের জীবন মান উন্নয়ন ও সকল চেতনার পরিবর্তন দ্বারা পাকা রাস্তার অদিক্ষে যোগাযোগ জীবন ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে আরো সুন্দর। ফলে আধুনিক জীবনের পূর্ণ সাদ পাওয়া যায় আড়ানী গ্রামে এলে।

আগস্ট ০৭
১১:০৭ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]