Daily Sunshine

আদালত পাড়ায় ভিড়, বাড়ছে বিচ্ছেদ-ভাঙ্গছে সংসার

Share

নুরুজ্জামান,বাঘা : আজকাল পত্র-পত্রিকা খুললে যে খবরটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তা হল গৃহবধুকে নির্যাতন অথবা বিবাহ্ বিচ্ছেদ। আর এসব কারনে আদালতের কাটগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীকে। এর ভয়াবহতা যেন দিন-দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শিক্ষিতদের মধ্যে ঘর ভাঙ্গার প্রবনতা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি বলে মন্তব্য করছেন সমাজের অভিজ্ঞ মহল । ফলে আদালতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে উপচে পড়া ভিড়।

তথ্য মতে, কেউ ভালোবেসে আবার কেউ-পরিবারের সিদ্ধান্তে ঘর বাঁধেন। শুরু হয় একটি সুখী সংসার-তথা পরশ পাথরের গল্প। ধন নয়, মান নয়, এইটুকু বাসায় করেছিনু বাঁচার আশা। প্রথম দিকে দাম্পত্য জীবনের বোঝা-পড়াটা হয়ে ওঠে “সোনার হাতে সোনার কাকন’’ কিন্তু বুকভরা আশা আর রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ঘর বাঁধলেও সবক্ষেত্রে ধরা দিচ্ছে না সুখ-পাখি।

কখনো কখনো মেহেদীর রঙ মোছার আগেই ভেঙে যাচ্ছে অনেকের সংসার। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সংসারের বন্ধন দুর্বল হচ্ছে ক্রমেই। যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে মানুষ। ভালো লাগা, ভালোবাসাও যাচ্ছে কমে। ফলে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। এ জন্য নারী-পুরুষ উভয়কে যেতে হচ্ছে আদালতের কাটগড়ায়। অনেকেই বলছেন, বর্তমানে এই প্রবনতা দিন-দিন বেড়েই চলেছে।

সম্প্রতি রাজশাহী চীপ জুডিশিয়াল আদালতে গিয়ে লক্ষ করা গেছে উপচে পড়া ভিড় এবং বিবাহ বিচ্ছেদের পর মহরানা (দেলমহর)আদায়ের চিত্র । দু’জন আইনজীবি এ প্রতিবেদককে জানান, বর্তমানে দুইটা করে উপজেলার জন্য বসছে একটি করে (এজলাস) আদালত। এ ছাড়াও মহা-নগরী (শহর)এর জন্য রয়েছে আলাদা আদালত। এ থেকে তাঁরা যে তথ্য জানালেন, তাতে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক বিবাহ বিচ্ছেন এর মামলা দেখভাল অর্থাৎ বিচার কার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে বিচারকদের।

তবে বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বর্তমান প্রেক্ষাপটে করোনা-সহ মানসিক, আর্থিক, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন, যৌতুক, মাদকে আসক্ত হয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন, পরকিয়া, চাকুরিজীবি স্ত্রী, বেকার স্বামী, প্রবাস জীবন কিংবা স্বামী-স্ত্রী পৃথক স্থানে চাকরী করার ক্ষেত্রে দুরুত্ব সৃষ্টি হওয়া এবং যোগাযোগ কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা । তাঁরা বলছেন, গত এক দশকে বদলে গেছে তালাকের ধরণ। আগে ৭০ শতাংশ তালাকের ঘটনা ঘটতো স্বামী কর্তৃক। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তালাকের ঘটনায় পুরুষের চেয়ে নারীরা দশগুণ এগিয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে ৮০ শতাংশ তালাকের ঘটনা ঘটাছে স্ত্রী ।

এ প্রসঙ্গে জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতকালে সংসার ছিল “সোনার হাতে সোনার কাকন’’। যতো সমস্যই সৃষ্টি হোকনা কেন একজন আরেক জনের হাত ছাড়তে নারাজ ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন ঠুনকো কাচের দেয়ালে পরিনত হয়েছে সেই বন্ধন। এ জন্য বিবাহ নিবন্ধক, পারিবারিক বন্ধন হ্রাস, বহুগামিতা, বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্ক, অতিমাত্রায় ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ, অর্থনৈতিক ভাবে নারীদের শক্ত অবস্থান, পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণেই বিবাহ বিচ্ছেদ ও আলাদা থাকার প্রবণতা বাড়ছে।

জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো সংস্থা (বিবিএস)তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরে তালাকের প্রবণতা বাড়ছে। শিক্ষিত স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে তালাক বেশি হচ্ছে। ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রকাশিত বিবিএসের-দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে তালাকের ঘটনা বেড়েছে ১৭ শতাংশ। গত বছর ১৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি ১ হাজার নারী-পুরুষের মধ্যে গড়ে ১ দশমিক ৪ টি তালাকের ঘটনা ঘটে।

তবে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বেশি তালাক হচ্ছে রাজধানী ঢাকা সিটিতে। ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় তালাক হচ্ছে ১টি করে। অভিজাত অঞ্চলখ্যাত উত্তর সিটিতে তালাকের প্রবণতা বেড়েছে ৭৫ ভাগ। দক্ষিন সিটিতে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। দুই সিটিতে আপোস হচ্ছে গড়ে ৫ শতাংশের কম। তালাকের সবচেয়ে বড় কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া ।

এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর দায়ের করা আবেদনের মধ্যে রয়েছে -স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসা, মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং নৈতিকতা-সহ বিভিন্ন কারণ।

অপর দিকে স্বামীর আবেদনে রয়েছে- স্ত্রী অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত হওয়া এবং সন্তান না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে একে অপরকে তালাক দেয়া ।

সার্বিক বিষয়ে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাপিয়া সুলতানা বলেন, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে নারীকে বিশ্লেষণ কিংবা নারী চাকরি করে বিধায় স্বামীকে অবহেলা করবে এমনটি মনোভাব তৈরী হলে সংসার হবে না। দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটনাতে হবে। পাশা-পাশি আমরা বড় বেশি বৈষয়িক হয়ে যাচ্ছি। এই অবস্থা থেকে সরে আসতে হবে।

জুন ১৭
০৯:০৬ ২০২১

আরও খবর