Daily Sunshine

পরিবর্তন হচ্ছেনা ভাগ্য তাই অপরাধে জড়াচ্ছে শিশুরা

Share

নুরুজ্জামান,বাঘা :গত ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার দায়িত্ব শিশুদের অধিকার রক্ষা করা। দেশের কয়েক লাখ শিশু বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় শিশুদের নির্যাতনের খবরও আমরা পেয়ে থাকি। কর্মক্ষেত্রে শিশুরা শিকার হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের। এসব শিশুদের জন্য আইন থাকলেও প্রয়োগের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

দেশের অভিঙ্গ মহলরা বলছেন, সামাজিক ক্ষতিকর প্রবনতাগুলোর মধ্যে অন্যতম শিশু শ্রমের ব্যবহার। অনুন্নত ও নিম্ন আয়ের দেশ গুলোর মত বাংলাদেশেও শিশু শ্রমের ব্যবহার অব্যহত রয়েছে। সরকার দেশব্যাপী কয়েক দশক ধরে শিশু শ্রম বন্ধের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করলেও বাস্তবে এর কোন সফলতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।ফলে দেশজুড়ে অসংখ্য শিশু চোরাচালান ও মাদকের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এছাড়াও অসংখ্য শিশু সস্তায় তাদের শ্রম বিক্রী করে চলেছে ঘাটে, বন্দরে, কল-কারখানা,হোটেল রেস্তোরা ও বাসা বাড়ীতে।

অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, শিশুশ্রম নিরসনে জাতিসংঘ প্রণীত সনদে আমাদের সরকার অনুস্বাক্ষর করেছেন। শিশুশ্রম নিরসনের জন্য কতগুলো পদক্ষেপ ঠিক করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়ম-নীতির প্রয়োগ, শিক্ষা, পুষ্টি , স্বাস্থ্য, সামাজিক সচেতনতা, গবেষণা, প্রশিক্ষন ইত্যাদি। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, কারা শিশু । এখানে বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে দেয়া যাবে না। ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কাজে নেওয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেওয়া যাবে না।

পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের শিশুশ্রম নীতি ২০১০ এ বলা আছে এটা বাস্তবায়ন করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন সরকার। বিশেষ করে যারা বাসা ও হোটেল রেস্তরায় কাজ করে, তাদের কল্যাণের জন্য একটা নীতিমালা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর সফলতা এখন পর্যন্ত লক্ষ করা যায়নি।

এ ক্ষেত্রে দরিদ্র দেশ সমূহে সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকার্ন্ডের সীমাবদ্ধতা থাকায় অন্যান্য প্রকল্পের মত শিশুদের উদ্ধার কল্পে যে সমস্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তা যেমন মাঝ পথে থেমে গেছে, তেমনি আমাদের দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্ব পরিকল্পনা বা প্রকল্প সমূহ পরিবর্তন ও নতুন পরিকল্পনা করতে করতে পার হয়ে গেছে একেক টি সরকারের সময়কাল।অনেক সময় দেখা গেছে, শিশুদের উদ্ধার কল্পে গৃহীত প্রকল্পই শুধু নয়, অসংখ্য মহত প্রকল্পও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে শিশু শ্রম ও উদ্ধার প্রকল্প কেবল কাগজেই সীমাবন্ধ রয়ে গেছে।

বর্তমানে দেশের সীমাস্তবর্তী জেলা-উপজেলা গুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, হাজার হাজার পথ শিশু। তারা জানেনা তাদের ভবিষ্যৎ কি ? পারিবারিক শৃঙ্খলা, অভাব, নদী ভাঙ্গন, পিতৃ পরিচয়হীন,পাচারকৃত ও নির্যাতনের শিকার এসব শিশু ঘুরে বেডায় শুধু-পথে ঘাটে। সারাদিন কাজ করে আর রাত হলে এরা ঘুমিয়ে পড়ে ফুটপাত, রেলস্টেশন, হাসপাতাল কিংবা মার্কেট এলাকার কোন বারান্দায়। দুবেলা দুমঠো ভাতের জন্য সকাল থেকে সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। এদের মধ্যে অনেক শিশুই রয়েছে, যারা বর্তমনে চোরাচালানের ও চুরির মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে। এতে করে বিভিন্ন সময় অনেক শিশু নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে।

এসব শিশুদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এদের অনেকেই রয়েছে, যারা শিক্ষা কিংবা বাসস্থান না পেয়েও হাসিমুখে থাকতে চাই। দুবেলা পেটপুরে ভাত খেতে পারলেই এরা মহাখুশি। ঘুমিয়ে পড়বে যেখানে সেখানে। অনেক পরিশ্রমের পর যখন তা জোটেনা তখন সৃষ্টি হয় নানা বিপত্তি। বেছে নেয় ভিন্ন পথ। চুরি ছাড়া এদের আর কোন পথ থাকেনা। এখানেই শেষ নয়, এদের জীবনে নেমে আসে চরম সর্বনাশ। এরা চোর, ছিনতাইকারী, ও চোরাচালানীদের খপ্পরে পড়ে ঢুকে পড়ে খারাপ জগতে। অনেক সময় নিজের অজান্তে নেশার পথও বেছে নেয় অনেকে। এদের খোঁজ কেউ রাখেনা।

সরেজমিন সীমান্ত এলাকা ঘুরে লক্ষ করা গেছে, এ দেশের হাজার-হাজার শিশু সরাসরি ফেন্সিডিল,গাজা ও হেরোইনে আসক্ত। হেরোইন সেবনের জন্য বাড়ির জিনিস পত্র চুরি করেও যখন হেরোইন কেনা সম্ভব হয়নি তখন তারা ছিনতায় কারী দলের সাথে মিস গেছে।এদের এ সকল জীবন থেকে সরানোর নিমিত্তে বাংলাদেশের দলীয় সরকারগুলো দলের প্রাধান্য রক্ষা করতে গিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং গনতন্ত্রের বিকাশ ঘটানও তাদের পক্ষে মোটেও সম্ভব হয়নি। বিধায় শিশু শ্রম এবং প্রাচার সংক্রান্ত যে পরিকল্পনাই আসুক না কেন, যতক্ষন তা সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন না হচ্ছে, ততক্ষন আমরা একে দলীয় স্লোগান বই আর কিছুই বলব না।
এ সব বিষয়ে সমাজের সুধীজনদের সাথে যোগাযোগকরা হলে তারা বলেন, অর্থনৈতিক দান্যতা, গরীব ঘরে শিশুর জন্মহার, পারিবারিক সহিংসতা, শিশুর প্রতি পারিবারিক অবহেলা, অবৈধ সন্তান জন্ম দেয়া, ভিন দেশে শিশু প্রাচার, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচারে শিশুদের ব্যবহার , সস্তায় শিশু শ্রম, পথ শিশু সৃষ্টির প্রধান কারন ।

তাঁদের মতে, অবহেলিত, লাঞ্চিত, শিক্ষা বঞ্চিত শিশুরাই পরিনত হচ্ছে পথ শিশুতে, সভ্য সমাজের গুনীজনদের কাছে হাত পেতে সাহায্য কামনা করছে এরা । কিন্তু সভ্যদের কী করার আছে-তাদের জন্য ? এ প্রশ্নের উত্তর জেনেও খুব সতর্কভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছে সমাজের ক্ষমতাসীন সভ্যরা। বার বার বিভিন্ন সরকার ও রাজনৈতিক দল এসব শিশুদের জন্য আইন তৈরী করছে, কিন্তু ভাগের চাকা লুটোপুটি করে খেয়ে ভদ্র মানুষের মত বদলে যাচ্ছে।

বাস্তবে এদের জন্য কখনই হচ্ছেনা নির্ভর যোগ্য কোন আবাসন। দায়িত্ববানরাও বাস্তবায়িত করতে পারছেনা কোন পরিকল্পনা, কাজেই পরিবর্তিত হচ্ছেনা এসব কোমলমতি শিশু শ্রমিকদের ভাগ্য রেখা।

জুন ১৫
১১:৩৬ ২০২১

আরও খবর