Daily Sunshine

মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে যা জানা জরুরী

Share

সানশাইন ডেস্কঃ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও সম্ভবত খুব অল্প সংখ্যক মানুষ মিউকরমাইকোসিস (পুরাতন নাম জাইগোমাইকোসিস) বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগটির নাম জানতো। ভারতে করোনা রোগীদের মধ্যে ঘাতক এ রোগটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এটির নাম এখন মুখে মুখে।

গত শনিবার আল-জাজিরায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ি ভারতে প্রায় ৯,০০০ মানুষ মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে মারা গেছে কমপক্ষে ২৯০ জন। আক্রান্ত ব্যাক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। বাকিদের ছিল উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস।

বাংলাদেশেও মিউকরমাইকোসিসের সংক্রমণ সনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজন মারাও গেছেন এ রোগে। করোনায় মারাত্মক অসুস্থদের বাঁচাতে স্টেরয়েড (যেমন-ডেক্সামেথাসন ইনজেকশন) ব্যবহারকেই মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হবার জন্য দায়ি করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনায় সাইটোকাইন স্টর্ম নামে এক ধরণের মারাত্মক অবস্থাকে সামলাতে ব্যাবহার করা হয় স্টেরয়েড। স্টেরয়েড ব্যবহার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। এ সুযোগটাই নেয় মিউকরমাইকোসিস রোগের জন্য দায়ি বিভিন্ন ধরণের ছত্রাক।

তবে, করোনার কারণে যে এ রোগের সংক্রমণ হচ্ছে তা নয়। মিউকরমাইকোসিস রোগটি প্রাচীন। প্রায় দুইশ বছর আগে এ রোগের সংক্রমণ সম্পর্কে প্রথম জানা যায়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মক দুর্বল তাদের এ রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।

অনিয়িন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগে ভুগছেন এমন রোগীরাও থাকেন উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকিতে। তাছাড়া, যাদের নিউট্রোপেনিয়া আছে ও অনেকদিন যাবৎ বিস্তৃত-বর্ণালীর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়েছে এমন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা থাকেন উচ্চ ঝুঁকিতে।

যারা ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ যেমন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ নিচ্ছেন তাদেরও হতে পারে মিউকরমাইকোসিস।

মিউকরমাইকোসিস একটি মারাত্মক কিন্ত বিরল রোগ। এটি এক ধরণের সুবিধাবাদি ছত্রাক সংক্রমণ। সুস্থ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়না। এটি সংক্রামকও নয়, এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায় না। এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার গড়ে ৫০ থেকে ৫৪ শতাংশ।

মিউকরমাইকোসিস রোগের জন্য দায়ি মূলত মিউকোরলেস বর্গের বিভিন্ন প্রজাতির ছত্রাক। ২০০৫ সালে প্রায় ৯০০ মানুষের এ রোগের জন্য দায়ি ছত্রাক পর্যবেক্ষণ করে রোডেন ও তাঁর সহকর্মিরা দেখেছেন এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক (৪৭%) রোগীর মধ্যে দায়ি ছিল রাইজোপাস। বাকি ৫৩ ভাগের মধ্যে ছিল ১৮% মিউকর, ৭% কানিংহামেলা, ৫% অ্যাপফিজোমাইসিস, ৫% লিকথেইমিয়া, ৫% সাকসেনিয়া, ৪% রাইজোমিউকর এবং অন্যান্য জেনাস বা গণের ৭% (সূত্রঃ Epidemiology and outcome of zygomycosis: a review of 929 reported cases. Clinical Infectious Diseases, 2005)। মিউকোরেলস বর্গের ছত্রাকসমূহ পরিবেশের প্রায় সর্বত্রই বিরাজমান। মাটি, গাছের বাকল ও পাতা, কম্পোস্ট, প্রাণীর মল, পচন্ত কাঠ ইত্যাদিতে প্রচুর মিউকোরেলস থাকে।

এ প্রকারের ছত্রাকগুলো সুত্রাকৃতির হাইফি দিয়ে তৈরি। এরা স্পোরাঞ্জিওস্পোর নামক এক ধরণের স্পোর তৈরি করে বংশবিস্তার করে। এদের স্পোরসমূহ বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

চামড়ায় ক্ষত থাকলে এটি ত্বক দিয়েও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে, শরীরে প্রবেশ করলেই যে মিউকরমাইকোসিস হবে তা নয়। সুস্থ মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারেনা এ ফাঙ্গাস।

আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ি মিউকরমাইকোসিস পাঁচ প্রকারেরঃ ১) রাইনোসেরেব্রাল মিউকরমাইকোসিস (এ রোগটি সাইনাসে হয় কিন্তু এটি মানুষের মস্তিস্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম), ২) পালমোনারি মিউকরমাইকোসিস (এটি ফুসফুসে হয়), ৩) গ্যাস্ট্রইন্টেস্টাইনাল মিউকরমাইকোসিস (এটি পরিপাকতন্ত্রে হয়), ৪) কিউটেনিয়াস মিউকরমাইকোসিস (এটি ত্বকে হয়), ৫) ডিসেমিনেটেড মিউকরমাইকোসিস যা রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্ন তন্ত্রকে আক্রমণ করে। ডিসেমিনেটেড মিউকরমাইকোসিসে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশী (প্রায় ৯৬%)।

এরপরে আছে গ্যাস্ট্রইন্টেস্টাইনাল মিউকরমাইকোসিস (মৃত্যুহার ৮৫%) এবং পালমোনারি মিউকরমাইকোসিস (মৃত্যুহার ৭৬%) (তথ্যসূত্রঃ Roden MM et al, 2005)। তবে গ্যাস্ট্রইন্টেস্টাইনাল মিউকরমাইকোসিস রোগের প্রকোপ অতটা বেশী নয়। মিউকরমাইকোসিস রোগের একটি বড় অংশই হল রাইনোসেরেব্রাল টাইপের (৩৯%), তারপর রয়েছে পালমোনারি (২৪%), ডিসেমিনেটেড (২৩%) এবং এবং কিউটেনিয়াস মিউকরমাইকোসিস (১৯%)। করোনার সাথে সম্পর্কিত মিউকরমাইকোসিস আক্রান্ত রোগীর মধ্যে এ পর্যন্ত রাইনোসেরেব্রাল এবং পালমোনারি মিউকরমাইকোসিস দেখা গেছে।

মিউকরমাইকোসিস রোগের ধরণ অনুযায়ি এ রোগের লক্ষণ নির্ভর করে। রাইনোসেরেব্রাল মিউকরমাইকোসিস রোগের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে মুখমণ্ডলের এক দিক ফুলে যাওয়া, মাথাব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাকের উপরের অংশে কাল ছোপ যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এবং জ্বর।

পালমোনারি মিউকরমাইকোসিসের লক্ষণ হল জ্বর, কাশি, বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। কিউটেনিয়াস মিউকরমাইকোসিস হলে ত্বকে ফোড়া বা ক্ষত হয় যা আসতে আসতে কালো হয়ে যেতে পারে। গ্যাস্ট্রইন্টেস্টাইনাল মিউকরমাইকোসিসের লক্ষণ হল- পেটে ব্যথা, বমি, এবং রক্তবমি ও রক্তপায়খানা। ডিসেমিনেটেড মিউকরমাইকোসিসের নির্দিষ্ট কোন লক্ষণ নেই। তবে, এটি মস্তিস্কে ছড়িয়ে পড়লে মানসিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে এবং রোগী কোমায় চলে যেতে পারে।

কিভাবে এ রোগ থেকে মুক্ত থাকা যাবে?
সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষদের মিউকরমাইকোসিস নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। শুধুমাত্র যারা উপরোল্লিখিত উচ্চ ঝুঁকি শ্রেণীতে পড়েন এমন রোগীদের বেশী ধুলাবালি আছে এমন জায়গা এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পরিহার করা ভালো।

তবে, রোগের জন্য দায়ি মিউকোরলেস বর্গের বিভিন্ন প্রজাতির ছত্রাক যেহেতু পরিবেশের সব জায়গায় বিদ্যমান এবং বাতাসে এদের স্পোর ঘুরে বেড়ায়, তাই সাবধানতা অবলম্বন যে খুব কাজে দিবে তা নিশ্চিত নয়। করোনার মারাত্মক অবসথা থেকে সুস্থ হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে।

মিউকরমাইকোসিসের চিকিৎসা কি? আগেই বলেছি এ রোগটি খুব বিরল কিন্তু মারাত্মক। সাধারণ ছত্রাকনাশক ওষুধ যেমন কিটোকনাজল, ভরিকনাজল ইত্যাদি মিউকরমাইকোসিসে কাজ করেনা। মোট তিনটি ছত্রাকনাশক এ রোগে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যামফোটারিসিন বি, পোসাকনাজল এবং ইসাভুকনাজল। এর মধ্যে শেষের দুটি ওষুধ আমাদের দেশে তৈরি হয় না।

দেশের মধ্যে শুধু বিকন ফার্মা টেরিসিন নামক ব্রান্ড নামে অ্যামফোটারিসিন বি ইনজেকশন তৈরি করে থাকে। কমপক্ষে চৌদ্দ দিন অ্যামফোটারিসিন বি প্রয়োগ করতে হয়। এ রোগের আরেকটি চিকিৎসা হল সার্জারির মাধ্যমে আক্রান্ত জায়গা কেটে ফেলা দেয়া।

মিউকরমাইকোসিস রোগটি ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কালো ছত্রাক রোগ নামে গণমাধ্যমে বেশী পরিচিতি পেলেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নামটি ব্যবহার না করাই উত্তম। কারণ, এ রোগের অনেক রোগের একটি লক্ষণের মধ্যে একটি হল আক্রান্ত জায়গা কালো রং ধারণ করা। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নামটি বেশী জনপ্রিয় হলে অন্য লক্ষণগুলোর গুরত্ব কমে গিয়ে এ রোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা তৈরির অবকাশ আছে। তাই, ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের পরিবর্তে মিউকরমাইকোসিস ব্যবহার যুক্তিসংগত।

এতে এ রোগের জন্য দায়ি ছত্রাকের নাম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এবং রোগটি সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য খুঁজে বের করতে সহায়ক হবে। আর বর্তমানে করোনার কারণে যেহেতু এ রোগের প্রকোপ বেড়েছে তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও করোনার টিকা নিয়ে করোনা প্রতিরোধ করতে পারলেই মিউকরমাইকোসিসের প্রকোপ এমনিতেই কমে যাবে।

-ড. মো. আজিজুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মে ২৮
২০:১৮ ২০২১

আরও খবর