Daily Sunshine

দূর্গাপুরে কৃষি জমিতে খনন কৃত পুকুর এখন গলার কাটা

Share

কৃষি জমি নষ্ট করে হাজার হাজার একর ফসলি জমিতে হয়েছে পুকুর খনন। এসব পুকুরই এখন গলার কাটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সবার। মাছের দাম কম, আর অতিরিক্ত পুকুর খননের ফলে অবিক্রিত হয়ে পড়ছে নতুন খনন করা পুকুর। লাখ লাখ টাকা খরচ করে মারাত্নক বিপাকে পড়েছেন এবার নতুন পুকুর খননকারীরা। কম দামেও লিজ নিতে চাইছেন না কেউ। ফলে অবিক্রিত হয়ে পড়ছে উপজেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক পুকুর। পুকুর লিজ না হওয়ায় ঋনের চাপে বিপাকে পড়েছেন পুকুর মালিকরা।

তেমনই একজন নুরুন নবী। বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর পৌর এলাকার দেবীপুর গ্রামে। তিনি উপজেলার কিসমত গণকৈড় এলাকার প্রায় ২৭বিঘা কৃষি জমি লিজ নিয়ে লাভের আশায় পুকুর খনন করেছেন। খননবাবদ খরচ করেছেন ১২ লাখ টাকা। কৃষকের কাছে চুক্তিভিত্তিক বিঘা প্রতি ৩৭ হাজার টাকা দিতে হবে। কিন্ত পুকুর খননের তাঁর দেড় মাস অতিবাহিত হলেও তিনি এখন পর্যন্ত পুকুর লিজ দিতে পারেননি।

নুরুননবী জানান, সবার দেখাদেখি তিনি পুকুর খনন করে ছিলেন। দেড় মাস অতিবাহিত হলেও তাঁর পুকুরে বিঘা প্রতি ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকার উপর দাম বলছে না। যে দাম ব্যবসায়ীরা আগে বলে ছিল, সে দাম এখন আর বলছে না। কিন্তু খনন বাবদ তাঁর ১২লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন খরচের টাকায় উঠছে না। তিনি বলেন, কৃষকরা ২৭বিঘা জমির খাজনার টাকা নিতে প্রতিদিন ধর্না দিচ্ছেন। পুকুর লিজ না হওয়ায় তাদের টাকাও দিতে পারছেন না। আবার নিজের টাকা না থাকায় পুকুরে মাছ চাষও করতে পারছেন না। ফলে ঋণের চাপে চরম বেকায়দায় তিনি রয়েছেন। শুধু নবী না, এরকম অভিযোগ উপজেলার সবখানেই পাওয়া যাচ্ছে।

উপজেলার হরিপুর গ্রামের আজাহার, দেবীপুরে আবু আরিফ, আবু বাক্কার, শাহজামাল, তরিপতপুর গ্রামের আমিনুল, নামোদুরখালীর মনসুর, রবিউল, জয়নগরের সাহাজান, পালশার ইসলাম, বড়ইলের হরিদুলসহ অসংখ্য পুকুরখনকারীরা জানিয়েছেন তাদের পুকুর খনন শেষ হলেও এখনও অবিক্রিত রয়েছেন। কারণ চারপাশে অতিরিক্ত পুকুর খনন হওয়ার ফলে পুকুর লিজ নেবার ব্যবসায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা আরও বলেন, লিজ দিতে না পারলে ঋণ করে হলেও তাঁরা পুকুরে নিজেরাই মাছচাষ করবেন।

জানা গেছে, গত ৭-৮ বছর আগে উপজেলায় নিচু জমিতে প্রথম পুকুর খনন শুরু হয়। এরপর পুকুর খনন লাভজনক হওয়ায় ধীরে ধীরে প্রতিবছর পুকুরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তৈরি হয় উপজেলায় পুকুর খনন কেন্দ্রিক দালাল সিন্ডিকেট চক্র। নিচু বিলের জমি শেষ হয়ে যাওয়া এসব দালাল সিন্ডিকেটরা উপরের তিন ফসলি কৃষি জমিতে আঘাত আনতে শুরু করে। কৃষকরা জমি দিতে না চাইলে জোরপূর্বক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুকুর খননও করা হয়েছে।

এ নিয়ে মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়েছে। অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। দেওয়া হয়েছে, ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা। তারপরও একটা পুকুর খননও বন্ধ হয় নি। বরং এখনও পুুকুর খনন চলছে। প্রায় ২০০বর্গকিলোটার আয়তন নিয়ে এ উপজেলা। রয়েছে ১২৪টি গ্রাম। প্রায় এলাকায় নিচু জমি আগেই শেষ হয়ে গেছে। দুই তিন বছর ধরে এখন উপরের জমিগুলোতে চলছে পুরোদমে পুকুর খনন। উপরের কৃষি জমি গুলোও এখন শেষের পথে। গত কয়েক বছরে উচু-নিচু মিলে প্রায় দেড় হাজার পুকুর খনন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

সূত্র মতে, চট্রগ্রাম, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পুকুর খননের গাড়ি ব্যবসায়ীরা উপজেলায় এসে বসতি গড়েছেন। তাঁদের সাথে স্থানীয় দালাল চক্র একজোট বেধে গরীব কৃষকদের জমি নিয়ে পুকুর খনন চালিয়ে যাচ্ছেন। পুকুর কেন্দ্রিক এসব দালাল সিন্ডিকেটের কেউ কেউ এখন কোটিপতি বনে গেছেন। পুকুর কেন্দ্রিক দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যেদের কাজ হলো- প্রথমে দুই একজন কৃষকের জমি উচ্চ মূল্যে দরদাম করে বায়না করেন। তারঁপর ওখানে গাড়ি নামিয়ে চারপাশ দখল করেন। এতে দালালরা আগে থেকেই ম্যানেজ রাখেন প্রশাসন। কৃষকরা তাঁদের জমিতে পুকুর খনন বন্ধ করতে প্রশাসনে অভিযোগ দিয়েও তখন আর কাজ হয় না। এসব জোরজবস্তি ঘটনা থানা আদালত পর্যন্ত গড়ালেও কোথাও বন্ধ হয়নি পুকুর খনন।

উপজেলার কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নের কয়ামাজমপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক ফেরদৌস জানান, বাড়ির ধানের ভাত খাওয়ার পবিরাবের কয়েক ভাইয়ের প্রায় বিঘা তিনেক জমি ছিল বাড়ির পাশের বিলে। গত জানুয়ারি মাসের দিকে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট আমাদের না বলে আমার জমির চারপাশে পুকুর খনন শুরু করে। এ সময় আমাদের জমিতে লাল নিশানা সাঁটিয়ে দেই। তাঁরপর প্রভাবশালী দালাল চক্র লাল নিশানা ভেঙে দিয়ে আমাদের জমিতে জোরপূর্বক পুকুর খনন করে। এ নিয়ে প্রশাসনে অভিযোগ দিয়েও কাজ হয়নি। বরং উল্টো প্রশাসন কৃষদের চাপ দেয় তাদের সাথে সমঝোতা করে নিয়েন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শুভদেবনাথ বলেন, নানা জায়গায় এসব পুকুর খনন ও রাস্তার মাটি উঠানোর বিষয়ে অভিযোগ আসছে। অতিশীঘ্রই এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিপূর্বে অনেক জায়গায় পুকুর খনন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালিয়ে জেল জরিমানাও করা হয়েছে।

জানতে চাইলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, পুকুর খননবন্ধে উপজেলা ইউএনও এসিল্যান্ডকে নিদেশ দেওয়া আছে। তাঁরা অভিযান দিয়ে পুকুর খনন বন্ধ করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল জরিমানা করবেন।

এপ্রিল ২৬
১০:২২ ২০২১

আরও খবর