Daily Sunshine

মহান স্বাধীনতা: নারী যোদ্ধা অরুনা সাহা

Share

ড. রুমি শাইলা শারমিন : আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে আজকের দিনে নারী পুরুষ যৌথ উদ্যেগে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিতে অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। যুগে যুগে নারী প্রেরনার উৎস হয়ে পুরুষের পাশাপাশি থেকেছেন। পরিবার, রাষ্ট্র এমনকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নারীর অবদান যেমন কম নয়, তেমনি অর্জনও থেমে থাকেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অসীম সাহসী বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত তারামন বিবির যুদ্ধজয়ের গল্পগাথা আজও শিহরিত করে আমাদের। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন কাঁকন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরা প্রমূখ। স্বাধীনতা সংগ্রামী সেই সব মহান নারীদের আজও আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

১৯৭১ সালে বাংলার ঘরে ঘরে নারীর যোগানো শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরনায় এক একজন যোদ্ধা ঘর হতে পা বাড়িয়েছেন। সে সময়ের বাস্তবতার কারনে নারীদের শুধুমাত্র অস্ত্র প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছিল তা স্বত্ত্বেও প্রচন্ড দেশাত্ববোধের কারনে অনেক নারীই পুরুষের পোশাক পরে অস্ত্র ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। আবার ঘরে বসে কেউ কেউ পোষ্টার, ন্যমপ্লেট তৈরী করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে রেঁধে খাইয়েছেন, কেউবা খাদ্য সরবরাহ করেছেন এক স্থান থেকে আর এক স্থানে। মানবসেবা মমতাময়ী নারীর চিরন্তন রুপ। নারীরা আহত মুক্তি সংগ্রামীদের আন্তরিকতাপূর্ন সেবাযত্ন, পরিচর্যা করেছেন এবং পেশাগত নারী চিকিৎসকরা ওষুধ পথ্য ও সেবাদান করে স্বাধীনতার স্বপক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, ট্রানজিট ক্যম্প থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষনে পাঠানোতে নারীর ভূমিকা ছিল অসাধারন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জনসংযোগ, সভা সমাবেশ, বত্তৃতা বিবৃতি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহিত সাক্ষাত করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায় এবং অর্থ সংগ্রহের জন্য আপ্রান চেষ্টা করেছেন সংগ্রামী নারীরা। এভাবে অজপাড়া গাঁয়ের হতদরিদ্র নারী থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিত পেশাজীবি নারীসহ সকল শিল্পী, বুদ্ধিজীবি মহলের নারীশক্তি স্ব-স্ব ক্ষেত্রে উদ্ভুদ্ধ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের এবং উদ্দিপিত রেখেছিলেন নিজেদেরকে দেশপ্রেমী হিসেবে।

সাত কোটি বাঙালির হৃদয় যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর তখনই জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। সেদিন বাঙালিকে যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন দেখায়। বেতার সম্প্রচার ক্ষমতা ছিল মাত্র দশ কিলোওয়াট কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণিত করার ক্ষমতা ছিল দুর্নিবার।মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এক একটি নারী কন্ঠ যোদ্ধাদের অবদান অপরিসীম। নারী পাঠিকার উপস্থাপিত মূল্যবান সংবাদ জনগনের মনোবল অক্ষুন্ন রাখতে বিরাট ভূমিকা রাখে। সাহিত্যকর্মী নারীরা তাদের লেখনীর মধ্য দিয়ে অনেক যুবক যুবতীদের যুদ্ধে অংশ নিতে অনুপ্রানিত করেছেন। “মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থা” গঠন করে দেশের নারী কন্ঠযোদ্ধারা পরিবেশন করেছেন পরাধীনতার শেকল ছেঁড়ার জন্য উত্তাল করা সেই সব সঙ্গীত। তাঁদের পরিবেশনায় মুক্তিযোদ্ধারা হতো অশ্রুসিক্ত তেমনি এক নারী কণ্ঠযোদ্ধা অরুনা সাহা। পিতা পরিমল সাহা এবং মাতা রেনুবালা সাহার কোল জুড়ে প্রথম সন্তান। ১৯৫২ সালে ফরিদপুর শহরের চকবাজারে অরুণ আলোর অঞ্জলি মেখে জন্ম নিলেন অরুনা। তাঁর নামের মতোই তিনি ছিলেন দেশ দরদী,মুক্তিযুদ্ধে ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। যিনি ১৯৬৮ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্র ও খুলনা কেন্দ্রের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। তখন একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভির নিয়মিত শিল্পী ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯৭১ সালে তিনি রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সে সময় ফরিদপুরের সকল শিল্পীদের নামের একটি তালিকা তৈরি হয় যেন দেখা মাত্রই তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ১৪৪ ধারা জারি হল। ফরিদপুর শহরের চারিদিকে পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে রেখেছে এই অবস্থায় জীবনের মায়া তুচ্ছ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসাবে নাম লিখালেন অসীম সাহসী নারী অরুনা সাহা। উত্তাল তারুণ্য আর স্বাধীনতার স্বপ্নময়তা কে সামনে নিয়ে এগিয়ে গেলেন তিনি। পিছনে ফেলে গেলেন পরিবার-পরিজনের মায়া।

মুজিবনগর সরকারের প্রধান মন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্ত্রের শিল্পীদের ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার নির্দেশ দেন ! পরে ব্যারিস্টার বাদল রশিদের নেতৃত্বে চিত্র পরিচালক দিলিপ সােমের ” বিক্ষুব্ধ বাংলা” গীতি আলেখ্য নিয়ে ১৪ সদস্যের একটি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে মুক্তিযােদ্ধাদের জন্য তহবিল গঠন করার উদ্দেশ্যে ভারতের বোম্বে সহ মহারাষ্ট্র, দিল্লী, গােয়া, পুনা, কানপুর, ইত্যাদি জায়গায় গণসংগীত পরিবেশন করেন । এভাবে মুক্তিযােদ্ধাদের জন্য কম্বল, পুলওভার, শতরঞ্চি, ওষুধ সামগ্রী সহ শরণার্থীদের জন্য ১১ লক্ষ টাকা নগদ অর্থ দান করেন তৎকালিন সময়ে। তিনি যে ক্যাম্পে ছিলেন তার নাম ছিল ” গোবরা” ক্যাম্প। এই ক্যাম্পের শিল্পীরা হলেন, আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, নমিতা ঘোষ, রথীন্দ্রনাথ রায়, রমা ভৌমিক সহ আরও অনেক নাম জানা অজানা শিল্পী বৃন্দরা । এই সকল অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন বোম্বের চিত্রাভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমান, সংগীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলীল চৌধুরী, সবিতা চৌধুরী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও যুগ্ম সচিব সলিল ঘোষ।

স্বাধীনতার সেই উত্তাল দিনগুলোতে “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”, “হায়রে কৃষান তোদের এই শীর্ণ দেহ দেখে যে রে অশ্রু মানে না”, “হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে, বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে”। সেই সময়কার কিছু গান প্রথম রেকর্ড হয় যখন তাতে অরুনা সাহার কন্ঠটি ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে রয়ে যায়। “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”, “জয় বাংলা বাংলার জয়” , “শোন একটি মুজিবরের কন্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের”, “সালাম সালাম সালাম হাজার সালাম”, “সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা”, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবাে বলে যুদ্ধ করি”, “রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি” তখন এই গান গুলো শুধু হারমোনিয়াম ও তবলা দিয়ে সর্ব প্রথম রেকর্ড করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিটি ক্যাম্পে গিয়েও সমবেত কণ্ঠেও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধারা সংগীত পরিবেশন করে মুক্তিযোদ্ধাদের অশ্রুসিক্ত করতেন, দেশ প্রেম জাগাতেন, অস্ত্র ধরে যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন দেখাতেন। দীর্ঘ ৯ মাস সবকিছু ছেড়ে শুধু দেশের মানুষের মুক্তির জন্য গান গেয়েছেন। ছাদ নেই এমন খোলা ট্রাকে ট্রাকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মুক্তির গান গেয়েছেন রোদ , বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে। পরবর্তীতে এই মুক্তির গান গাওয়া শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত হয় ‘মুক্তির গান’ নামক ছায়াছবি। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ কালীন তাঁদের গান গাওয়া এবং ত্যাগের ইতিহাস চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

নারী যোদ্ধা অরুনা সাহা ব্যক্তি জীবনে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের পর বিএড ও এমএড সম্পন্ন করে শ্বশুর মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। স্বামীর সাথে গড়ে তুলেছেন সংগীত বিদ্যালয়। স্বাধীনতা উত্তর কালেও সরকারি ও বেসরকারি ভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল তাঁর অবদান, অর্জনও থেমে থাকেনি। পেয়েছেন বহু সম্মাননা স্বারক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পুরস্কার। গোবরা ক্যাম্প ও মুক্তিযোদ্ধা নারী সংবর্ধনা, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সম্মাননা স্বারক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি থেকে সম্মাননা এবং শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার সহ অসংখ্য পুরস্কার। পেয়েছেন কন্ঠযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি। আর মৃত্যুর পরে পেলেন সর্বোচ্চ পুরস্কার ” রাষ্টীয় মর্যাদা”। ১৪ মার্চ ২০১৯ রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় চির বিদায় নিলেন।

আজ গৌরবে, আনন্দে, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে উঠেছে বাঙালী নারী। আগামী শতশত বছর পরেও নারী অবদানের ক্ষেত্রে নারী যোদ্ধাদের অবদান উজ্জল নক্ষত্রের আলো হয়ে জ্বলবে। ঠিক তেমনি স্বদেশপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকবে মুক্তির গানের এক সম্মানিত কণ্ঠযোদ্ধা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অরুনা সাহার নাম।

লেখক: ড. রুমি শাইলা শারমিন, কবি, কলামিস্ট ও বেতার ব্যক্তিত্ব

সানশাইন/২৫ মার্চ/রনি

মার্চ ২৫
২১:২৮ ২০২১

আরও খবর

Subcribe Youtube Channel

বিশেষ সংবাদ

ঈদের আগে ৫০ লাখ পরিবার পাচ্ছে আর্থিক সহায়তা

সানশাইন ডক্সে; করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ওয়েভে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ গরিব পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। প্রত‌্যকে পরিবারকে ২৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। ঈদের আগে মোবাইলের মাধ্যমে সুবিধাভোগী পরিবারের হাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার হিসেবে এ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

টিকা কার্ড নিয়ে যাতায়াত করা যাবে

টিকা কার্ড নিয়ে যাতায়াত করা যাবে

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতির কারণে ১৪ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে এ সময়ে টিকা কার্ড নিয়ে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে বলে জানানো হয়েছে। সোমবার (১২ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অতি জরুরি প্রয়োজন

বিস্তারিত