Daily Sunshine

নিভৃতে চলে গেলেন ‘শেখ সাহেবের চেয়ারম্যান’

Share

রবিউল ইসলাম রবি, দুর্গাপুর: দেলশাদ আলী দেওয়ান (৭৩) ছিলেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ৪নং দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন ঠিক ওইসময়ে দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন দেলশাদ আলী দেওয়ান। অনেকেই তাকে শেখ সাহেবের চেয়ারম্যান বলে ডাকতেন। বৃহস্পতিবার ভোরে বঙ্গবন্ধুভক্ত দলপাগল এ মানুষটি মৃত্যুবরণ করেছেন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলেও দলের কোন নেতাকর্মী তার পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেননি।
বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও দেলশাদ আলী দেওয়ানদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রীড আওয়ামী লীগ নেতাদের দোর্দন্ড প্রভাব প্রতিপত্তির মুখে এরকম অসংখ্য দেলশাদ আলী চাপা পড়ে আছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার দাবি ছিলো তার। কিন্তু অনেকটা আক্ষেপ আর না পাওয়ার হতাশা নিয়েই তিনি চলে গেলেন।
ক্ষমতার পালা বদল ও সময় পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে দেলশাদ আলীর রাজনৈতিক জীবনেও ভাটা পড়ে। জীবদ্দশায় তিনি রেডিও এবং টেলিভিশন মেরামতের কাজ করেছেন। আর এ কাজের মাধ্যমেই পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি সংসার চালিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ার ছেড়ে দেলশাদ আলী দেওয়ানের ঠিকানা হয়েছিলো দুর্গাপুরের হাট কানপাড়া বাজারে। বাজারের একটি খুপরি ঘরই তার জীবিকা নির্বাহের শেষ ঠিকানা ছিলো।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলেও আওয়ামী লীগের কোন নেতা তার পাশে দাঁড়াননি। এমনকি তার পরিবারে খোঁজ পর্যন্ত কেউ নেননি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা কি তাহলে এভাবেই ধুকে ধুকে মারা যাবেন? নাকি এখনো যারা জীবিত আছেন তাদের ব্যাপারে সরকার সহায়তার হাত প্রসারিত করবেন। ন্যুনতম চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা টুকুও করা যেতে পারেনা কি দল পাগল এসব মানুষদের জন্য? আসাকরি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
দেলশাদ আলী দেওয়ান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর্দশকে ধারন করে ছাত্র জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ না নিলেও এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেই ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে নিহত জানিক মাষ্টারের সহযোগী ছিলেন তিনি। অথচ মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও এখন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন বলেও তিনি আক্ষেপ করেন মৃত্যুর আগে মূহুর্ত পর্যন্ত।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর রাজনীতিতে আরো বেশি সক্রিয় হোন এবং দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেন। উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বগুড়া ও রাজশাহী জেলার মাত্র দুটি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নে ওইসময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থী ছিলেন তিনি। নির্বাচনে পাশ করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সাথে নাটোর গণভবনে একাধিকবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে তার। এছাড়া রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদস্য এএইচএম কামারুজ্জামান হেনার সাথেও দলীয় সভায় একাধিকবার অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় আসীন হোন। এরপর ইউনিয়ন পরিষদ ভেঙ্গে গেলে তিনিও আত্মগোপনে যান। পরবর্তিতে দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হলে এলাকায় ফিরে আসেন।
ওইসময় তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ ১২টি মামলা হয়। মামলার ঘানি টানতে গিয়ে তাকে সহায় সম্বল হারাতে হয়। এ কারণে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে তাকে বেছে নিতে হয় রেডিও টেলিভিশন মেরামতের কাজ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পেশার মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ ও ২০০৮ থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও দেলশাদ আলী দেওয়ানের কেউ খোঁজ নেননি। অনুপ্রবেশকারী, চাটুকার ও হাইব্রীডদের চাপে তিনি ছিলেন অনেকটাই কোনঠাসা। নির্বাচন আসলেই কেবল তার কদর বাড়তো। নির্বাচন পার হলে তার খোঁজ কেউ রাখতেন না।
ব্যাক্তি জীবনে তিনি ৪ ছেলে ও ৬ মেয়ের জনক। তিনি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতেন তখনই বিয়ে করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি তৎকালীন বখতিয়ারপুর হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেলশাদ আলী দেওয়ানের বর্তমান সরকারের কাছে কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না। তার একটাই চাওয়া ছিলো, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা। তবেই তিনি তৃপ্তির ঢেকুর তুলবেন বলে আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু কোনটাই তার দেখা হলো না।
না পেরেছেন নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে, না দেখে যেতে পারলেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার। দেলশাদ আলী দেওয়ানের মতো হাজারো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী আজ অবজ্ঞা অবহেলায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অথচ অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রীড নেতাদের এখন পোয়াবারো।

সানশাইন/২৯ আগস্ট/এমওআর

আগস্ট ২৯
১৪:১৬ ২০২০

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

ডিগ্রী থাকলেও মিলছেনা যোগ্য চাকরি

ডিগ্রী থাকলেও মিলছেনা যোগ্য চাকরি

শাহ্জাদা মিলন: বাংলাদেশের অন্যতম বিভাগীয় শহর রাজশাহী। সিল্কসিটি, আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সারা দেশে রাজশাহী। তবে এসব পরিচয় ছাপিয়ে রাজশাহী ‘শিক্ষা নগরী’ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। অসংখ্য নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে। এর সুফলে রাজশাহীতে বছর বছর বাড়তে ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা। তবে সেই অনুপাতে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। রাজশাহীতে রয়েছে রাজশাহী

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সানশাইন ডেস্ক : করোনা মহামারিতে সাধারণ ছুটিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে স্থগিত ছিল সরকারি-বেসরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। এ কয়েক মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পায়নি দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী। অংশ নিতে পারেনি কোনো নিয়োগ পরীক্ষাতেও। অনেকেরই বয়স পেরিয়ে গেছে ৩০ বছর। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি চাকরির আবেদনে সুযোগ শেষ হয়ে যায় তাদের। তবে এ দুর্যোগকালীন

বিস্তারিত