সর্বশেষ সংবাদ :

রেমালের তাণ্ডব : এবারও ‘ঢাল হয়েছে’ সুন্দরবন

সানশাইন ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাত ও ভারী বৃষ্টিপাতে উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ উপজেলায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকছে; প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম।
ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে অসংখ্য বাড়িঘর ও গাছপালা। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে চিংড়ি ঘের; জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ অংশে ছয় হাজারের বেশি বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন। উপকূলবাসী মনে করছেন, বরাবরের মতো এবারও প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব থেকে উপকূল রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবন। নিজে লড়াই করে ঘূর্ণিঝড় থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করছে এই বন।
সুন্দরবনের কারণে এবারও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ‘কম’ হয়েছে বলে মনে করেন খুলনা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ। তিনি বলেন, “ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের যে বাতাসের বেগ, সেটি ছিল ৯০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। এটি যখন উপকূলে আঘাত হেনেছে; তখন উপকূল এলাকায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাসের বেগ ছিল।
“ঝড়গুলো যে বেগে আসে, সেই তুলনায় ভূমিতে কম বেগে প্রবেশ করে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এটা অতিক্রম করে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে। সুন্দরবন এলাকায় এটা যখন প্রথমে ওঠে তখন দেখা যায়, বাতাসের যে সর্বোচ্চ গতি থাকে সেটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সামনে আগালেও সে গতিটা থাকে না।“
খুলনার সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ক্লাইমেট মুভমেন্ট’ এর সমন্বয়ক শর্মিলা সরকার বলেন, “সুন্দরবন যেন উপকূল এলাকায় প্রকৃতির দেয়াল। বাংলাদেশে ঝড় প্রবেশের মুখেই সুন্দরবনের অবস্থান। “এর কারণে ঝড় প্রবেশ করতেই বনে বাধার সম্মুখীন হয়। এতে বনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হলেও লোকালয়ে বড় দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে।”
খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ননী গোপাল মণ্ডল বলছিলেন, ভৌগোলিকভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার জনপদ ও বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে সুন্দরবনের অবস্থান। গাছপালায় আচ্ছাদিত সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কম টের পেয়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল ও বঙ্গোপসাগর তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষ। রেমাল উপকূলে আঘাত হানার সময় জলোচ্ছ্বাসের পানির উঁচু চাপও ঠেকিয়েছে এই বন।
ননী গোপাল বলেন, “ঝড়ের সময়ে সুন্দরবন নিজে লড়াই করে ক্ষতবিক্ষত হলেও উপকূলের তেমন ক্ষতি হতে দেয় না। তবে ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট উঁচু জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুন্দরবনের হরিণ, বানর, বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। “এছাড়া মিঠাপানির পুকুর তলিয়ে যাওয়ার কারণে বনের প্রাণিকুল ও বনকর্মীদের বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে।”
ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো জানান। রোমালের আঘাতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইলেতিনি বলেন, “বনের অভ্যন্তরে ২৫টি টহল ফাঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়্ উঁচু জোয়ারে বিস্তীর্ণ বনভূমি প্লাবিত হয়েছে। সাগরের নোনাপানিতে বনভূমির সঙ্গে তলিয়ে গেছে ৮০টি মিঠাপানির পুকুর।
“সেখান থেকে বনের প্রাণী ও বনজীবীরা খাবার পানি পেতেন। এতে বনে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হবে।” বন সংরক্ষক বলেন, “অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে হরিণ ভেসে গিয়ে মারা যাওয়ার খবরও মিলেছে। পাশাপাশি আরও বন্যপ্রাণীর মৃত্যু ও ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
“সুন্দরবনের গাছপালার কারণে ঝড়ের পুরো ধাক্কাটা টের পাননি সুন্দরবন-সংলগ্ন লোকালয়ের বাসিন্দারা,” বলছিলেনসুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী ও প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির। “যদিও সুন্দরবন এবারও ডুবেছে আরও উঁচু জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের পানিতে। ৫ থেকে ৭ ফুট উঁচু জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে গোটা সুন্দরবন।” যোগ করেন তিনি।
খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. নাজমুল হুসেইন খান বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ৬০টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে ও উপচে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
ঝড়ে প্রায় ৭৭ হাজার ৯০৪টি বাড়িঘর বিধ্বস্ত এবং ৪ লাখ ৫২ হাজার ২০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। নাজমুল বলছেন, “এছাড়া ফসলের মাঠ, ঘের-পুকুর লোনা পানিতে ভেসে গেছে। ঘূর্ণিঝড় চলাকালে বটিয়াঘাটা উপজেলায় গাছ চাপা পড়ে লাল চাঁদ মোড়ল নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।”
খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য রশীদুজ্জামান মোড়ল জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছা ও কয়রায় বেশ কয়েকটি জায়গার বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বহু গাছপালা ভেঙে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জমির ফসল। এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো পরিবার।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, জেলায় এবার ১২ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭১৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষেতে ছিল; যা ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে। আক্রান্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে, আউশ ধানের বীজতলা ৫৪ হেক্টর, তিল ৪৮৫ হেক্টর, মুগডাল ২৭০ হেক্টর, মরিচ ১৭৫ হেক্টর, আদা ৩৩ হেক্টর, হলুদ ২০৩ হেক্টর, চিনাবাদাম ৩০ হেক্টর, ভুট্টা দেড় হেক্টর, পেঁপে ৩১০ হেক্টর, কলা ৫৪৫ হেক্টর ও পান ৮৭৭ হেক্টর ও আখ ৭২ হেক্টর।
এসব ফসলের পাশাপাশি কয়েক হেক্টর জমির তরমুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।” পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, “দাকোপের খলিশা, পানখালী, বটবুনিয়া ও কামিনিবাসিয়া এবং কয়রার দশালিয়া বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এই পাঁচটি জায়গা মিলে ১৫০ মিটারের মতো বাঁধ বিলীন হয়ে গেছে।
“দাকোপ, বটিয়াঘাটা, কয়রা ও পাইকগাছায় আরও ৬০টা পয়েন্টে পানি উপচে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাইকগাছায় অনেক জায়গায় ওভার ফ্লো হয়েছে। সব মিলিয়ে এরই মধ্যে ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” রেমানের ভুক্তভোগীরা জানান, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ উপজেলার অনেক জায়গায় বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। কিছু কিছু জায়গায় পানি ঢোকা বন্ধ করতে পারলেও বড় ভাঙার জায়গাগুলো আটকানো সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল বলেন,ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো সংস্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে।


প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২৪ | সময়: ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ