সর্বশেষ সংবাদ :

রিমালের আঘাতে ১০ জন নিহত বিদ্যুৎহীন সোয়া কোটি মানুষ

সানশাইন ডেস্ক: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অন্তত ১০ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭ জন বরিশাল বিভাগের, ২ জন খুলনা বিভাগের এবং ১ জন চট্টগ্রামের। এমনটাই উঠে এসেছে ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে। বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের বরাত দিয়ে এ সংখ্যা জানিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. শওকত আলী ৭ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘অধিকাংশই নিহত হয়েছেন বিধ্বস্ত ঘর অথবা ধসে পড়া দেওয়ালের নিচে চাপা পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের কারণে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত এখনো চলছে এবং একই সঙ্গে বাতাসও বইছে তীব্র গতিতে।’
খুলনা বিভাগে ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে আরও দুজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার হেলাল মাহমুদ। বার্তা সংস্থা এএফপিকে প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘এই ঘূর্ণিঝড়ে কারণে খুলনা বিভাগে অন্তত ১ লাখ ২৩ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার মধ্যে ৩১ হাজার ঘরবাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে।’
এদিকে, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার তোফায়েল ইসলাম জানিয়েছেন- তাঁর বিভাগে রিমালের প্রভাবে অন্তত ১ জন নিহত হয়েছেন। তবে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এখনো তাঁর বিভাগে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
অপরদিকে, রিমালের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগহীন হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মুখ্য প্রকৌশলী বিশ্বনাথ শিকদার জানিয়েছেন, অন্তত ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগহীন অবস্থায় আছেন। তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আবারও বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করব।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঝালকাঠির নলছিটির বাসিন্দা নুরুল হকের চারতলা ভবনের কার্নিশ ঘেঁষে দেয়ালটি করা ছিল। ঘূর্ণিঝড়ে দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ দোকানের ওপর ধসে পড়ে। জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই দুই পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হবে। একইসঙ্গে ভবন মালিকের কোনও ত্রুটি আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিচুল হক জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনের লাশ এবং একজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন। খুলনা প্রতিনিধি জানান, গাছচাপায় লাল চাঁদ মোড়ল (৩৬) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ২৬ মে রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পর ২৭ মে সকালে বটিয়াঘাটার বাসায় ফিরে যান তিনি। এরপর সেখানে গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল হুসাইন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, দৌলতখানে ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে ঘরের ভেতরে গাছ চাপা পড়ে শিশু মাইশার (৪) মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২৭ মে) ভোর ৪টার দিকে পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। মাইশা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের মনির হোসেনের মেয়ে। এর আগে ভোরে ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে ঘর চাপা পড়ে মনেজা খাতুন (৫০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ঝড়ে জেলায় দুজনের মৃত্যু হলো।
মাইশার বাবা মনির জানান, রবিবার রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি সবাই। ভোর ৪টার দিকে হঠাৎ একটি গাছ আমার ঘরের ওপর পড়ে। এতে টিনের চালে চাপা পড়ে মাইশা মারা যায়। আমিও চাপা পড়ি, স্থানীয়রা এসে উদ্ধার করেছেন।
বসতঘরে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মনেজা খাতুন লালমোহন উপজেলার চর উমেদ গ্রামের আব্দুল কাদেরের স্ত্রী। রাতে মনেজা খাতুন তার এক নাতিকে নিয়ে ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোরে ঝোড়ো বাতাসে তার টিনের ঘর ভেঙে চাপা পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান মনেজা। অক্ষত আছে তার নাতি।
এ বিষয়ে দৌলতখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সত্যরঞ্জন খাসকেল বলেন, ঘরের ওপর গাছ চাপা পড়ে এক শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়েছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, মৃত দুজনের পরিবারকে সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।
অপরদিকে, ঝড়, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার উপকূলীয় অঞ্চল। উপকূলের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সব ফসল লোনাপানিতে ডুবে গেছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, মনপুরা, লালমোহন, তজুমদ্দিন ও চরফ্যাশন উপজেলায় মোট ১০টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রবিবার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের নাপিতখালি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে শওকত মোড়ল নামে এক বৃদ্ধ মারা যান। পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, একইদিন বিকালে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধূলাসর ইউনিয়নের কাউয়ারচর এলাকায় ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে প্লাবিত এলাকা থেকে বোনকে রক্ষা করতে গিয়ে মো. শরীফুল ইসলাম নামে একজনের মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নগরীর বায়েজিদ থানার টেক্সটাইল এলাকায় দেয়াল চাপায় মারা গেছেন সাইফুল ইসলাম হৃদয় নামের এক পথচারী। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝড়ের সময় ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। এ সময় একটি দেয়ালের পাশে আশ্রয় নেন হৃদয়। হঠাৎ দেয়ালটি ভেঙে পড়লে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস তার মরদেহ উদ্ধার করে।


প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২৪ | সময়: ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ