নারীদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

সানশাইন ডেস্ক: নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমাদের মেয়েদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে তাদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে।” বুধবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘আইসিপিডি থার্টি গ্লোব্যাল ডায়ালগ অন ডেমোগ্রাফিক ডাইভার্সিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “এই বৈশ্বিক সংলাপ আয়োজনের জন্য বাংলাদেশকে নির্বাচন করায় আমি ইউএনএফপিএ-এর নির্বাহী পরিচালককে সাধুবাদ জানাই। এ অনুষ্ঠানে আগত ৪৮টি দেশের প্রতিনিধিদের আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানাই। জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন অর্জনে আপনাদের আগ্রহ ও প্রত্যয় আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।”
তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পরেই ১৯৭২ সালে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর দিকনির্দেশনায় প্রণীত ১৯৭৩-১৯৭৮ মেয়াদের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়। তিনি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল গঠন করেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যার সভাপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। তবে ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতাদখলকারী অগণতান্ত্রিক সরকারগুলোর অপরিণামদর্শী নীতির কারণে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় আশানুরূপ সাফল্য দেখা যায়নি।”
তিনি বলেন, “দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করি নতুন ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি’।
শেখ হাসিনা বলেন, “২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আমরা সরকারে ছিলাম না। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সব কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। আমাদের দেশের মানুষ প্রাথমিক যে স্বাস্থ্যসেবা পাবে সেই সুযোগটা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে আমাদের জনসংখ্যা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে আসে।”
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রতি ছয় হাজার নাগরিকের জন্য সারা দেশে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করার উদ্যোগ নেই। সেই সময় আমরা জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি গ্রহণ করি, যার মূল লক্ষ্য ছিল শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের বিদ্যমান অপুষ্টি কমিয়ে আনা। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নেও আমরা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করি। নারী ও পুরুষের মধ্যে অসমতা দূরীকরণ, নারী শিক্ষার বিস্তার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রেও ছিল আমাদের আন্তরিক প্রয়াস।”
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “২০০৯ সালে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর আমরা আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন-এর ১৫টি মূলনীতি বাস্তবায়নে জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২ প্রণয়ন করি। মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার হ্রাস, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা, শিশু ও কিশোর-কিশোরী প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প পুনরায় চালু করি। বর্তমানে সারাদেশে সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। এগুলোর মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাসহ ৩০টি অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার ক্লিনিকে স্কিল্ড বার্থ এটেনডেন্স সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র/পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক হতে মা, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২২০০টি কেন্দ্র থেকে সার্বক্ষণিক স্বাভাবিক প্রসব সেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রসূতিসেবা প্রদানের জন্য এসব কেন্দ্রে ৪ জন করে ধাত্রী নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমি ৩০ হাজার ধাত্রী নিয়োগের অঙ্গীকার করেছিলাম। এর ধারাবাহিকতায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ২০ হাজার ধাত্রী নিয়োগ করা সম্ভব হবে বলে আমি আশা করি।”
গত ১৫ বছরে এসব উদ্যোগের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু হার প্রতি হাজারে ২১ জন, যা ২০০৬ সালে ছিল হাজারে ৮৪ জন। একইভাবে মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে ২০০৬ সালের ৩৭০ জন থেকে ১৩৬ জনে হ্রাস পেয়েছে।” শেখ হাসিনা বলেন, “বর্তমান সরকারের আমলে বাল্যবিবাহ আইন সংশোধন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং নারী ও কন্যাশিশুদের কল্যাণে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগের ফলে বাল্যবিবাহের হার বহুলাংশে কমেছে।”
বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের মেয়েদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে তাদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে।” শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা জাতীয় কৈশোর স্বাস্থ্য বিষয়ক কৌশলপত্র (২০১৭-২০৩০) এবং এর বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।”
সরকারপ্রধান বলেন, “আমরা জাতীয় বাজেটের মোট ৩০ শতাংশ নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য বরাদ্দ রেখেছি। বেইজিং ঘোষণা ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও জাতীয় কর্মসূচি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের শ্রমশক্তির ৪২.৬% নারী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০%-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইসিটি খাতে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫% এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০% নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।”


প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৪ | সময়: ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ