দুর্ঘটনায় তিন ভাইয়ের মৃত্যু : শোকে স্তব্ধ গোটা গ্রাম, ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছে মা-বাবা

অহিদুল হক, বড়াইগ্রাম: ‘দুই বছর আগে মাদরাসা শিক্ষক স্বামীকে হারিয়েছি। একমাত্র ছেলেকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় আল্লাহ আরো দুই ভাতিজা-ভাগিনার সঙ্গে আমার অন্ধের যষ্ঠি সন্তানটিকেও কেড়ে নিলেন। এখন আমি কি নিয়ে বাঁচবো, ফাঁকা বাড়িতে কিভাবে বাঁচবো আমি।’ দু’চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মাদরাসা ছাত্র খায়রুল বাশার সাগিরের মা। তিনি নাটোরের বড়াইগ্রামের গোপালপুর গ্রামের মৃত মাওলানা ইউনুস আলীর স্ত্রী।
জানা যায়, গত ১২ এপ্রিল শুক্রবার উপজেলার ধামানিয়াপাড়া গ্রামের এনজিও কর্মী সাইদুল ইসলামের সঙ্গে গোপালপুর গ্রামের আব্দুল খালেকের মেয়ে খায়রুন্নাহার আফরিনের বিয়ে হয়। ১৫ তারিখ সোমবার সাইদুলের বাড়িতে বৌভাতের অনুষ্ঠান ছিলো। সে অনুষ্ঠান শেষে দুলাভাইয়ের মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়িতে ফিরছিল মাওলানা আব্দুল খালেকের ছেলে আকিব হাসান, মৃত মাওলানা ইউনুস আলীর ছেলে খায়রুল বাশার সাগির ও মাওলানা রুহুল আমিনের ছেলে জাওহার আমিন লাদেন।
তারা সম্পর্কে পরস্পর মামাতো-ফুফাতো ভাই। পথে বড়াইগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে মোটর সাইকেলের ধাক্কা লেগে তিনজনই গুরুতর আহত হন।
খবর পেয়ে স্বজনরা তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিনই আকিব হাসান (১৫) এবং গত শনিবার খায়রুল বাশার সাগির মারা যান। সবশেষে বুধবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ এ জাওহার আমিন লাদেন মারা যান।
নিহত আকিব বড়াইগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির, সাগির রাজশাহী মারকাজুল ইসলামিয়া সালাফিয়া মাদরাসার আলিম প্রথম বর্ষে এবং জাওহার বড়াইগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। একই গ্রামের তিনজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে এক সঙ্গে হারিয়ে গোটা গ্রাম যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার সরেজমিন গোপালপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি তিনটি বাড়ির বাসিন্দা ছিল তারা। পাশেই কবরস্থান। সেখানে পাশাপাশি কবর দেয়া হয়েছে তাদের। গ্রাম জুড়ে বিরাজ করছে শোকাবহ পরিবেশ। বাবা-মাসহ স্বজনরাও যেন শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। প্রাণবন্ত ভদ্র শান্ত তিনজন ছেলের এমন প্রস্থানে গ্রাম জুড়ে যেন নেমে এসেছে রাজ্যের নীরবতা।
এ সময় নিহত আকিবের বাবা আব্দুল খালেক বলেন, সেদিন মেয়ে জামাইয়ের বাড়িতে আকিবসহ ওই তিনজনকে আমি নিজে ভাত-মাংস পরিবেশন করে খাইয়েছি। খাওয়া শেষে ছেলে তার দুলাভাইয়ের বাইকে অপর দুজনকে বাড়িতে রাখতে এসেছিল। পথে এসে নতুন চালানো শেখা আমার ভাগিনা সাগির গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে হাসপাতালে নেয়ার পরই আমার ছেলের জীবন প্রদীপ নিভে গেলো। নিজে কষ্ট চেপে রাখতেও ওর মাকে প্রবোধ দিতে পারছি না। সারাক্ষণ ছেলের ছবি, ব্যবহার্য কাপড়-চোপড় বুকে জড়িয়ে কাঁদছে।
নববিবাহিতা খায়রুন্নাহার আফরিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বিয়ের পর হাসি-আনন্দে সংসার জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় আমার আদরের ছোট ভাইসহ তিনজন মানুষ হারিয়ে গেলো। সংসার জীবনের শুরুতেই এতো বড় আঘাত পাবো, এভাবে ভাইসহ স্বজনদের হারাবো তা কল্পনাও করিনি। তাদের এমন বিদায় কিছুতেই মানতে পারছি না।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষক আবু সাঈদ বলেন, তারা তিনজনই খুব ছোট বেলা থেকেই নামাজ পড়তো। পারিবারিক শিক্ষা আর ধর্মীয় আবহে বেড়ে উঠায় তাদের আচরণ ছিলো অত্যন্ত নম্র, ভদ্র। এতো অমায়িক আচরণের তিনটি ছেলে এভাবে চলে যাবে এটা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
বড়াইগ্রাম পৌর মেয়র মাজেদুল বারী নয়ন বলেন, একটা দুর্ঘটনায় একই মহল্লা থেকে একে একে তিনজন শিক্ষার্থীর এমন নির্মম মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।


প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৪ | সময়: ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ