সর্বশেষ সংবাদ :

শব্দ দূষণকারী বাইকের শব্দে শরীরে বাধঁছে নানা রোগ 

শাহ্জাদা মিলন : 
শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর সড়কগুলোতে চলছে বিভিন্ন ব্রান্ডের দামীয় মোটরসাইকেল ও স্পোটর্স কার। ধনী পরিবারের সন্তানদের হাতে দেখা মিলছে এসব বাইক ও কারের। বিপত্তি হচ্ছে বেশ কিছু মোটরসাইকেল ও কারে সাইলেন্সারের ধরণ নতুনভাবে বদলে তৈরি করেছেন বিকট শব্দ। রাজশাহী শহরে রাজ মেট্রো হ ১২-২৭২৩,রাজ মেট্রো ল ১১-৮০৯৬, রাজ মেট্রো ল ১২-৫০৩৪, রাজ মেট্রো ল ১২-০৩০৪, নাটোর ল ১১-৮০৮৬, রাজ মেট্রো ল ৫০-২৬০৮,রাজ মেট্রো হ ১২-২৪১৮,রাজশাহী ল ১২-৩৫৬১, ঢাকা মেট্রো হ ৩৬-৮৫৮০,রাজশাহী মেট্রো ১২-০০২৩ বাইক গুলোতে লাগানো হয়েছে তীব্র শব্দ যুক্ত হলার। তবে বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী নম্বর বিহীন গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি।

 

 

আবার এসব প্রতিটি গাড়ির বডি,হেডলাইট,হ্যান্ডেল,এমনকি বসার সিট পরিবর্তন করা হয়েছে। এই গাড়িগুলোর গতি যতো বেশি থাকছে শব্দ ততো বেশি হচ্ছে। এতে নাগরিকদের শারীরিক সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে এই গাড়িগুলো। শান্তির নগরীকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে গুটিকয়েক এই বাইক ও কার। এর বিরুপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে পরিবেশে। এসব বাইকারদের বয়স ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া এদের বেশিরভাগের নেই গাড়ি চালনোর লাইসেন্স। এই গাড়ির শব্দ দূষণের কারনে অস্বস্তি থেকে বাদ যাচ্ছেনা শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউই। সাইলেন্সারে লাগানো তীব্র শব্দের গাড়ির ড্রাইভাররা পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই গাড়িগুলো মূল সড়কে দেখা না মিললেও অলিগলিতে সবসময় দেখা মিলছে।

 

 

উপশহর এলাকায় বিপুল হোসেন নামে এক দোকানী জানান, আমি হার্টের রোগী। কয়েকবছর আগে ইন্ডিয়া থেকে হার্টের অপারেশন করে এসেছি। ডাক্তার বলেছে জোরে হাটা নিষেধ,শব্দ বেশি এমন স্থানে থাকা নিষেধ। এত হার্ট বেশি পাম্পিত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। যার কারনে অনেক নিয়মের মধ্যে দিন পার করতে হয়। তবে সাইলেন্সারে হলার লাগানো উদ্ভট শব্দ তৈরি করা বাইকগুলোকে দোকানের সামনে দিয়ে গেলে টিকে থাকতে পারিনা যন্ত্রনায়। এই গাড়িগুলোকে যদি না বন্ধ করা যায় যেকোন সময় আমার মতো রোগীরা হার্ট এ্যাটাক করে মৃত্যু বরণ করলে তার দায়ভার কে নিবে ? তিনি অবিলম্বে শহরে বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত হওয়া বাইক স্টান্ট শো বন্ধ সহ এই বাইক ও কারগুলোকে আজীবন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেয়ার দাবি জানান।

 

 

তিনি আরো দাবি জানান, উপশহরের মতো আবাসিক এলাকা সিটি মেয়রের পরিবারসহ এছাড়া অনেক গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা এই এলাকায় বসবাস করেন। এই এলাকায় যদি এমন বাইক ও কার নিয়মিত চলতে থাকে অন্য এলাকায় কি অবস্থায় হয় সেটি বুঝতে বাকি নেই। অবিলম্বে এই গাড়ি গুলোকে আটকের সাথে সাথে তাদের পিতামাতাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, বখে যাওয়া ছেলেরা কিভাবে সমাজটাকে শেষ করছে ,আমাদেরকে অসুস্থ করে তুলছে সেটি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তাদের কানের কাছে শোনানোর দাবি করেন।

 

 

চাকুরীজীবি আহমেদ হোসেন টুটুল জানান, এ ধরণের গাড়ি বন্ধে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করে যতো শীঘ্রই সম্ভব এটা বন্ধ করার দাবি জানান।

 

 

রাসেল জামান নামের এক ব্যবসারী জানান, রাস্তায় কিংবা বাসায় থেকেও আমরা ভুক্তভোগি এই গাড়ি গুলোর কারণে। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মাথা ব্যাথা করে দীর্ঘক্ষণ,বুক ধরফড় করতে থাকে। এই গাড়ি গুলো বন্ধের জন্য বেশ কয়েকবার ১২১ নম্বরের সাহায্য চেয়েছি। বাইকের সাথে গাড়ির শব্দগুলো ইদানিং বাড়ছে। যারা গাড়ির মেকানিক তাদের কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করা না গেলে এধরণের গাড়ির সংখ্যা কমবে না। এই গাড়ি আটকানোর সাথে সাথে কোন মেকানিক তৈরি করে দিয়েছে তাদেরকেও বড় অংকের জরিমানা ও আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান তিনি।

 

বাবু নামের আরেক ব্যবসায়ী জানান, এধরণের বাইক আটকিয়ে সাথে সাথে পুড়িয়ে ফেলা দরকার যাতে অন্যরা এই জঘন্য সাউন্ডের গাড়ি বানাতে সাহস না পায়। এ ধরণের তীব্র শব্দের কারনে ঘরে কিংবা বাইরে অসুস্থ রোগীরা আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। ঘুমিয়ে থাকা শিশুরা উঠে যাচ্ছে ফলে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে ঘরে থাকা নারীদের।

 

 

তীব্র শব্দের কারনে কি ধরণের শারীরিক ক্ষতি হয় এ বিষয়ে বারিন্দ মেডিকেল কলেজের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগি অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের জানান, তীব্র শব্দ দূষণকারী বাইকের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় বাইক চালক নিজেই। কারণ পথচারীরা কিছুক্ষণের জন্য শারীরিক অস্বস্তি হয় আর এ শব্দ বাইক চালক সব সময় ফলে দীর্ঘ মেয়াদী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সে নিজে। এক সময় তার কানে শোনার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে এই বাইক চালকদের কোন ওষধ, ইয়ারিং রিং কিংবা অপারেশন করেও কানে শোনার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না।

 

ডা.জুবায়ের আরো বলেন, ৭০ ডেসিবলের শব্দ আমরা কানের জন্য স্বাভাবিক হিসেবে নিই কিš‘ এর বেশি হলে সেটি শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। যতবেশি ডেসিবল বাড়বে ক্ষতির মাত্রা ততো বাড়বে। যারা দীর্ঘক্ষণ শব্দযুক্ত মেশিনের পাশে কাজ করেন তারা পরবর্তীতে কানে শুনতে পান কম। এই তীব্র শব্দ কানের পাশাপাশি শরীরের নার্ভে ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশি। কারো কানের পর্দা ফেটে গেলে অপারেশন করে ঠিক করানো সম্ভব তবে নার্ভ নষ্ট হয়ে গেলে আর কিছুই করা সম্ভব নয়।

 

এছাড়া অত্যধিক শব্দ কানে বাজার কারণে টিনিটাস হতে পারে। টিনিটাসে আক্রান্ত ৫০-৯০ শতাংশ রোগী শব্দদূষণের কারণে এ সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

 

তিনি আরো বলেন, প্রচণ্ড শব্দ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের কারণে ঘুমকে বাঁধা দিতে পারে। আশপাশে আওয়াজ হলে শান্তির ঘুম নষ্ট হতে পারে। ফলে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। শব্দদূষণের কারণে ঘুম কমে যায় ও মানসিক অ¯ি’রতা বেড়ে যায়। ফলে অস্বস্তি, ক্লান্তি ও মেজাজে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কান মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযুক্ত, যা শরীরের উদ্দীপনা প্রতিক্রিয়া সমন্বয় করে। এ কারণে কানে আঘাত করা সব শব্দ তরঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য মস্তিষ্কে পাঠানো হয়। এর মানে হলো অত্যধিক শব্দও মস্তিষ্কে যায় ও বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট অনুসারে, এই ধরনের শব্দ মস্তিষ্ককে নিস্তেজ করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমতে শুরু করে।

 

ডা. আব্দুল্লাহ আরো জানান, অতিরিক্ত শব্দ হৃদযন্ত্রকে ‘উত্তেজিত’ করে তোলে। অত্যধিক শব্দের কারণে হৃৎপিণ্ডও বিরক্ত, দ্রুত স্পন্দিত ও রক্তচাপ বেড়ে যায়। উ”চ শব্দে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনও নিঃসৃত হয়। তাই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে থাকলে রক্তচাপও বেড়ে যায়।

যদি রক্তচাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে এটি উ”চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের মতো হৃদরোগ সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার রোগের মধ্যে আছে উ”চ রক্তচাপ ও আর্টেরিওলোস্ক্লেরোসিস, যা রক্তনালিগুলোর সংকোচনের কারণে ঘটে। আবার অত্যধিক শব্দ বিরক্তি বা ক্রোধের কারণ হতে পারে। যারা বেশিক্ষণ তীব্র শব্দের মধ্যে থাকেন তারা ক্রমাগত মাথাব্যথার সমস্যায় ভোগেন। এটি মানসিক চাপের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে উদ্বেগ বাড়ে ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়।

 

তিনি বলেন, অবাক করা হলেও সত্যিই যে, প্রজনন স্বাস্থ্যের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে শব্দদূষণ। নারী এমনকি পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের বিরূপ প্রভাব ফেলে শব্দদূষণ। এমনকি গর্ভবতী নারীরা যদি অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকেন, তাহলে তাদের এমনকি গর্ভের সন্তানের ওজন কমতে থাকে।

 

এ ধরণের বাইক বন্ধের বিষয়ে রাজশাহী আরএমপি উপ-পুলিশ কমিশনার ( ট্রাফিক) ( অতিরিক্তি ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) অনির্বান চাকমা কে রবিবার বিকেলে ফোন দেয়া হলে তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

সানশাইন / শামি

 


প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২৪ | সময়: ৯:৪৮ অপরাহ্ণ | Daily Sunshine

আরও খবর