স্বতন্ত্রদের ভূমিকা কী হবে: সংসদে এখনো স্পষ্ট নন স্বতন্ত্ররা

সানশাইন ডেস্ক: সংসদে নিজেদের ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। আগামী রোববার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবনের বৈঠক থেকে সংসদে ভূমিকার প্রশ্নে এবং সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা।
৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২৩ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। ১০ জানুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। সেদিন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদ নেতা নির্বাচিত করে। পরদিন শপথ নেয় নতুন মন্ত্রিসভা। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দলের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবেই ভূমিকা রাখবেন বলে আমি জানি।
তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল কারা হবে, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলের আসনে বসবেন কি না। স্বতন্ত্রদের ভূমিকা আসলে কী হবে-এসব বিষয়ে নানা আলোচনা রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের অনেকে বলছেন, তাঁদের বেশির ভাগই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সংসদে ভূমিকা রাখতে চান। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ বলছেন, দলে যুক্ত না হয়ে তাঁরা স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবেই ভূমিকা রাখবেন, দলে এই আলোচনা রয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, এটি আগেই পরিষ্কার ছিল। প্রশ্ন ছিল প্রধান বিরোধী দল কারা হবে, তা নিয়ে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পর এবার সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলটি ১১টি আসন পেয়েছে। কিন্তু তাদের চেয়ে অনেক বেশি, ৬২টি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাঁদের ৫৮ জন আবার আওয়ামী লীগেরই নেতা।
এমন পটভূমিতে কারা প্রধান বিরোধী দল হবে, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন-এসব প্রশ্ন সামনে আসে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা মিলে নির্দলীয় জোট করে প্রধান বিরোধী দল এবং তাঁদের একজনকে বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আবেদন জানানোর সুযোগ আছে। তবে একাধিক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের বড় অংশই বিরোধী দলে বসার বিপক্ষে। তাঁরা চান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হলেও তাঁরা আওয়ামী লীগের নেতা। তবে এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাঁদের সঙ্গে নেবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
আগামী রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দেবেন। অন্যদিকে কেউ কেউ স্বতন্ত্রদের একটি মোর্চা করে বিরোধী দলে বসার পক্ষেও আছেন। তাঁদের পাওয়া আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত নারী আসন কীভাবে বণ্টন হবে, সে বিষয়েও এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা এখন পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও করেননি।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী রোববার আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে নিজেদের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। তাঁরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে নিজেরা বসে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে দলীয় প্রধানের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বাস্তবতা নেই বলেও মনে করেন কেউ কেউ। বৈঠকে দলীয় প্রধান জানতে চাইলে স্বতন্ত্ররা নিজ নিজ অবস্থান থেকে বক্তব্য তুলে ধরবেন। তবে তাঁরা মূলত অপেক্ষা করছেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনার জন্য। রোববার সে নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে এরপর তাঁরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করবেন।
প্রশ্ন ছিল প্রধান বিরোধী দল কারা হবে, তা নিয়ে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পর এবার সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলটি ১১টি আসন পেয়েছে। কিন্তু তাদের চেয়ে অনেক বেশি, ৬২টি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাঁদের ৫৮ জন আবার আওয়ামী লীগেরই নেতা। ফরিদপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ কে আজাদ বলেন, ‘আগামী রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দেবেন। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, আমরা সেভাবে কাজ করব।’ এবার জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল কারা হবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতিমধ্যে বলেছেন, জাতীয় পার্টিই বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বলেছেন, বিরোধী দলে বসা না বসার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী সিদ্ধান্ত দেন, তা দেখার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।
বরিশাল-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ বলেন, যাঁরা স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাই দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে থেকে রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই তাঁরা স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছিলেন। দল সে সুযোগ না দিলে এটি হতো না। এখন দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ যাবেন বলে তিনি মনে করেন না।
টাঙ্গাইল-৪ আসনে এবার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি সভায় হজ ও তাবলিগ জামাত সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার এবং মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়। এবার তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। লতিফ সিদ্দিকী এই আসন থেকে এর আগে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সংসদে স্বতন্ত্রদের ভূমিকার প্রশ্নে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের নেতা। তাঁরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে যাবেন, এটা ভাবা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে এখনো তাঁর সঙ্গে কারও আলোচনা হয়নি। তবে তিনি শুনেছেন, যেহেতু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা আওয়ামী লীগের নেতা, তাঁরা দলের প্রতিনিধিত্ব করতে চান। তিনি নিজে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের হয়েই সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে চান। কিন্তু দলে যুক্ত না হয়ে তাঁরা স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখবেন, এমনটা চাইছেন ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের অনেকে। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘স্বতন্ত্রদের বেশির ভাগই দলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। এরপরও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দলের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবেই ভূমিকা রাখবেন বলে আমি জানি।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, এখন প্রধানমন্ত্রী তাঁদের বৈঠকে ডেকেছেন। এই বৈঠকেই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসতে পারে।


প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৭, ২০২৪ | সময়: ৪:০৩ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ