এগিয়ে যাচ্ছে ইআইবিএ প্রকল্পের কাজ, বরেন্দ্রে চাপ কমবে ভূ-গর্ভস্থ পানির

স্টাফ রিপোর্টার: বর্তমান সরকার সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সরকারি প্রাধান্যকে গুরুত্ব দিয়ে তা অর্জনের লক্ষ্যে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে ভূ-উপরিস্থ এবং বৃষ্টির পানি ব্যবহারের উপর জোর দিয়ে ইআইবিএ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
দেশের উত্তর পশ্চিমাংশে অবস্থিত রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত শুষ্ক ও তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি। শুষ্ক মৌসুমে এসব এলাকার ভূ-পরিস্থ পানির অনেক স্বল্পতা থাকে। অন্যদিকে বর্ষাকালে পদ্মা, মহানন্দা, পূনর্ভবা, রানী ও বারনই নদীতে প্রচুর পানি থাকে। এসব নদীর পানি সংরক্ষন করে শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজে ব্যবহার করা গেলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত করা সম্ভব হবে।
ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে বরেন্দ্র এলাকায় খালে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীর পানি ব্যবহারের (ভূ-উপরিস্থ পানি) মাধ্যমে ‘বরেন্দ্র এলাকার খালে পানি সংরক্ষনের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারন-২য় পর্যায়’ সেচ সম্প্রসারণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার বরেন্দ্র ভূমির কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে প্রকল্পটি অক্টোবর ২০২২ হতে জুন ২০২৭ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন করে।
বিএমডিএ’র চেয়ারম্যান বেগম আখতার জাহান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ব শেখ হাসিনা যে ভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শুধু মাত্র তার দূরদর্শী চিন্তার ফলে এত দূত বাংলাদেশ এখন উন্নতবিশ্বের কাতারে পৌছিয়ে গেছে। দেশে আজ মানুষ খাদ্যের অভাবে না খেয়ে থাকেনা মানুষ। আজ তিন বেলা খাবার খেয়ে জীবন যাপন করছে। এই উন্নয়ন শুধু শেখ হাসিনা সরকার এর ফলে সম্ভব হয়েছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট নিরসনে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে ভূ-উপরিস্থ এবং বৃষ্টির পানি ব্যবহারের উপর জোর দিয়েছি। যাতে করে মানুষ যেন বর্ষা মৌসুমের পানি কাজে লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করতে পারবে। আমাদেরকে সব সময় চিন্তুা করতে হবে অল্প খরচে কি ভাবে কৃষককে সর্বচ্চো সেবা দেয়া যায় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানির চাপ কমাতে ইআইবিএ প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে পানির জন্য সকল জায়গায় ফসল ফলাতে অনেক সমস্যা হত সেখানে এই রকম যুগোপযোগী সব প্রকল্প গ্রহন করার ফলে কৃষক এখন আর পানির অভাব বুঝতে পারে না, কৃষক এখন সঠিক সময় তারা তাদের পানি পায় এবং ফসল ফলাতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, বিএমডিএ ইআইবিএ প্রকল্প থেকে জানা যায়, প্রকল্পটির অধিক্ষেত্র রাজশাহী বিভাগের ৩টি জেলা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট উপজেলা, রাজশাহী জেলার বাগমারা ও গোদাগাড়ী উপজেলা এবং নওগাঁ জেলার মহাদেবপুরসহ সর্বমোট ৮টি উপজেলা। এই প্রকল্পের আওতায় খাল/খাড়ী, পুকুর ও বিল পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি তথা ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ এবং সোলার পাম্প ও ভূ-গর্ভস্থ পাইপ লাইন ব্যবহারের মাধ্যমে রবি ও খরিপ মৌসুমে ফসলে সেচ সহায়তা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া, ভূ-গর্ভস্থ পানির রিচার্জ বাড়বে, নবায়নযোগ্য সৌর শক্তি ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহারের উপর চাপ হ্রাস পাবে এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পুষ্টির চাহিদা পূরণসহ পরিবেশের উন্নয়ন হবে।
এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ৩ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে সেচ নিশ্চিত হবে। ফলে প্রতিটি জমিতে বছরে ২/৩টি করে ফসল চাষাবাদের মাধ্যমে ২৭হাজার ৯২০ মে.টন ফসল উৎপাদিত হবে। যা খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হবে। সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেচযন্ত্রের দক্ষতা, ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা এবং প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করায় সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পে ১৩২টি সেচ যন্ত্র (এলএলপি) সাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ দ্বারা সেচ কার্যক্রমে পরিচালিত হবে। সেচ মৌসুমে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহার হবে এবং সেচ মৌসুম ব্যতীত অন্যান্য সময়ে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ বিকল্প ব্যবহার হিসাবে জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। সেচ কার্যক্রমে পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের দ্বারা সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি সহজলভ্য করা সম্ভব হবে।
বরেন্দ্র এলাকার খালে পানি সংরক্ষনের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারন-২য় পর্যায়’- শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাজিরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক একনেক সভায় পাঁচ বছর মেয়াদী অনুমোদিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৪৯ দশমিক ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। উক্ত প্রকল্পের আওতায় ৩৮ দশমিক ২৫ কি.মি খাস খাল/খাড়ী, ১টি পুকুর ও ২টি বিল পূন:খনন, ১৩টি সাব-মার্জড ওয়্যার নির্মাণ, নদীতে ৪টি পন্টুন স্থাপন ও ২টি মেরামত, পন্টুনে ২৬টি এলএলপি পাম্প স্থাপন, ৪৫০/৫০০ মিমি ডায়া বিশিষ্ট ৭২.৭০কি.মি দৈর্ঘ্যরে পাইপ লাইনের মাধ্যমে নদী হতে খালে পানি সংরক্ষন করা হবে। খাল হতে ১৩২টি সোলার এলএলপি ও ৪০টি সরাসরি পাম্পিং স্কীমের মাধ্যমে ৩৪৯০ হেক্টর জমিতে ১৪৮ কি.মি দৈর্ঘ্য ২৫০মিমি ডায়া পাইপ লাইনের মাধ্যমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক আরো জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শুরুতেই কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। পূন:খননকৃত খালের পাড়ে ১ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা রোপন করার সংস্থান রয়েছে। বিএমডিএ এই প্রথম এইচডিপিই পাইপের মাধ্যমে সেচ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বাগমারা উপজেলায় রাণী নদী হতে খালে পানি সরবরাহের জন্য ৮০০ মিটার এবং শিবগঞ্জ উপজেলায় মহানন্দা নদী হতে খালে পানি সরবরাহের জন্য ১৫০০ মিটার এইচডিপিই পাইপ লাইন নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে এবং ৫৫০মি. খালখনন ও ৫ হাজার ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে। এছাড়া বাগমারা, গোমস্তাপুর ও মহাদেবপুর উপজেলায় সোলার এলএলপি স্থাপন কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলায় রাণী নদীতে একটি পন্টুন নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছে। পূণর্ভবা নদীর কাজিগ্রাম এলাকায় স্থাপনের জন্য আরও একটি পন্টুন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।


প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৩ | সময়: ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ