কমিটি পেয়ে বেপরোয়া রাবি ছাত্রলীগ: হলে হলে সিট দখল, মারামারি, অস্ত্র প্রদর্শন

লাবু হক, রাবি:
গত মাসের ২১ অক্টোবর কমিটি ঘোষণার তিনদিন পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ। সেই হিসেবে নতুন কমিটির ক্যাম্পাসে অবস্থানের সবেমাত্র একমাস পূর্ণ হয়েছে। তবে এই একমাসের ব্যবধানেই যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ ও তাদের অনুসারীরা।

 

যদিও ক্যাম্পাসে প্রবেশের পরই নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিব উপস্থিত সকলের সামনে ‘রাবিতে সিট বাণিজ্যের কবর রচনা করা হল’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো সামনে না আসলেও আবাসিক হলগুলোতে বৈধ শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দিয়ে বেশ কয়েকটি সিট দখলের চেষ্টা করেছেন তারা।

 

এছাড়া ‘রুম ওয়ার্ক’র নামে হলের কোন সিট কবে খালি হবে তা জানতে হলের কক্ষগুলোতে গিয়ে তালিকা প্রস্তুতির কাজও চালাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি ছাত্রলীগেরই অন্যান্য নেতার অনুসারীদের সিট থেকে নামিয়ে দেয়া এবং ক্যান্টিনে বসার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন এবং মারধরের ঘটনাও ঘটিয়েছেন নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ ও তাদের অনুসারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের গত ৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ১৫৬ নম্বর কক্ষে জামাল উদ্দীন নামের এক বৈধ শিক্ষার্থীর আসন দখলে নিতে আসেন হলের ২০৫ নম্বর কক্ষে থাকা আরেক শিক্ষার্থী। তিনি বৈধ শিক্ষার্থীর বিছানা নামিয়ে দিয়ে নিজের বিছানাপত্র বিছিয়ে নেন সেই আসনে। নিজের কক্ষ থাকা সত্বেও আরেক কক্ষে আসন দখলে নিতে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘মোমিন ভাই আমাকে এই কক্ষে আসতে বলেছে। আমি তো হুকুমের দাস।’

মোমিন ইসলাম শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর অনুসারী।

১৩ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী বিবেক সাহাকে কক্ষ থেকে নামিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে দেশীয় অস্ত্রসহ উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থানের ঘটনা ঘটে। এঘটনায় হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারী তাফকিফ আল তৌহিদ এক জুনিয়র কর্মীকে হলে আসন দিতে বিবেক সাহাকে তার কক্ষ থেকে নামিয়ে দেন। এ সময় বিবেক সাহাকে কক্ষ থেকে বের করতে বাধা দেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন। বিষয়টি নিয়ে তাফকিফ আল তৌহিদ ও শামীমের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হয়। এসময় উভয়পক্ষ বাঁশ, লোহার রড ও পাইপ নিয়ে হলের ভিতরে এবং বাইরে মুখোমুখি অবস্থা নেন। পরবর্তীতে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

২১ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের ১৪০ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী নিকল রায়কে তার বৈধ আসন থেকে নামিয়ে দেন শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মিনহাজ ইসলাম। তিনি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারী। একই দিন হলের ২৩৩ নম্বর কক্ষে থাকা দীপক রায় নামের আরেক শিক্ষার্থীকে হল থেকে নামিয়ে দেন মিনহাজ। এ বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি উভয়পক্ষকে নিয়ে সেদিন রাতে বসে সমাধানের কথা জানালেও এখন পর্যন্ত সেটির সমাধান হয়নি। বর্তমানে নিকল রায় তার কক্ষের মেঝেতে থাকেন এবং দ্বীপক রায় হল ছেড়ে ছাত্রাবাসে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।

 

গত ২২ নভেম্বর আবারও শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ২১৪ নম্বর কক্ষে শাহাবুদ্দিন নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠে হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও হল ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা রনি, পাঠাগারবিষয়ক সম্পাদক শাকিল শাহরিয়ার, শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মো. ইয়ামিন, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক শওন কুমার কুন্ডুর বিরুদ্ধে। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী। রনির কথামত শাহাবুদ্দিন হলের ১৫৬ নম্বর কক্ষের আরেকটি খালি হওয়া আসন দখল করতে না যাওয়ায় তাকে রুমে দরজা লাগিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে জানা গেছে।

 

 

২৪ নভেম্বর মতিহার হলের ক্যান্টিনের একই সিটে জাহিদ হাসান ও শান্ত নামের দুই শিক্ষার্থীর আগে ও পরে দুপুরের খাবার খেতে বসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগে দুই পক্ষের কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জাহিদ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য সাকিবুল হাসান বাকির এবং অপরদিকে শান্ত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী। এঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের পাশে ভাস্কর সাহাকে মারধর করেন সাকিবুল ইসলাম বাকির অনুসারীরা। পাল্টা আক্রমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ মার্কেট থেকে সাকিবুল হাসান বাকিকে মারধর করে ক্যাম্পাস ছাড়া করেন শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতাকর্মীরা। বিষয়টি নিয়ে এদিন রাত পর্যন্ত চলে উত্তেজনা। এসময় অনেকর হাতে স্ট্যাম্প দেখা যায়।

 

এছাড়া গত ২৫ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলে উচ্চস্বরে গান বাজাতে নিষেধ করায় এক শিক্ষার্থী ও আরেক সাংবাদিককে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মী। সর্বশেষ গত ২৬ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ মার্কেটে পূর্বের খেলার জের ধরে আইন বিভাগের নিজ সহপাঠিকে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মী।

 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিব বলেন, এগুলোর অনেক বিষয় ইতোমধ্যে মীমাংসা করে দেয়া হয়েছে। আমরা কাউকে সিট দখল করার বা কোনো আবাসিক শিক্ষার্থীকে নামিয়ে দেয়ার নির্দেশনা দেইনি। তবে যারা ছাত্রলীগের মাধ্যমে সিট নিয়ে আছে সেগুলোর খোঁজ-খবর নিতে বলা হয়েছে। কে কখন হল ছাড়বে সেটা দেখা হল প্রশাসনের বিষয়।

 

 

ক্যাম্পাসে কোনো অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু বলেন, দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। সেগুলো আমি এবং আমার সাধারণ সম্পাদক বসে সমাধান করে দিয়েছি। হলে আসলে কারা থাকে সেটা জানার জন্য আমরা খোঁজ নিতে বলেছি। তবে হলে কে কোন আসনে থাকবে সেটা হল প্রশাসন দেখবে।

 

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে আছেন জানিয়ে প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, হলের বিষয়গুলো হল প্রাধ্যক্ষদের দেখতে বলা হয়েছে। কারোর বৈধ সিট দখলে নিয়ে কাউকে সরিয়ে দেয়ার আইনগত বৈধতা কারোর নেই। এ বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। আর ক্যাম্পাসে বিক্ষিপ্তভাবে যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলোতে আমরা তাৎক্ষণিক যাচ্ছি এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। আমরা এসকল বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে আছি।

সানশাইন / শামি


প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২৩ | সময়: ৭:৫৯ অপরাহ্ণ | Daily Sunshine