তিন যুগ ধরে রাবিতে বাজে গণেশের বাঁশি

লাবু হক, রাবি: ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। নিজেও গান লিখেন। নিজস্ব ভঙ্গিমায় ফাঁকা গলায় নিজের গানের সুরও তোলেন। যাত্রাপালায় কাজ করেছেন একসময়। ইচ্ছে ছিল টেলিভিশনে কাজ করবেন। তবে সে স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাঁশি বিক্রিকে। এখন বাঁশি বিক্রি করেই সংসার চালান তিনি।
তিনি হলেন নিজের তৈরিকৃত বাঁশি বিক্রেতা করা শ্রী গণেশ চন্দ্র দাশ। দীর্ঘ তিনযুগ ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাঁশি বিক্রি করেন তিনি।
পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা গণেশের পৈত্রিক বাড়ি নাটোর জেলায়। ছোট বেলায় নাটোরে বেড়ে উঠলেও ১৭ বছর বয়সে চলে আসেন রাজশাহী। তার চারজন ছেলেমেয়ে রয়েছে। বড় সন্তানদের বিয়ে হওয়ায় এক সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমানে রাজশাহীর পুঠিয়াতে থাকেন তিনি। রাবি ক্যাম্পাস ছাড়াও তিনি রাজশাহী শহর, বাঘা, নাটোর, বগুড়া সদর ও সান্তাহারে ঘুরে ঘুরে বাঁশি বিক্রি করেন তিনি।
ক্যাম্পাসের প্রাক্তন থেকে শুরু করে বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত মুখ গণেশ। ব্যাগ ভর্তি বিভিন্ন ধরণের বাঁশি হাতে ক্যাম্পাসে দেখা যায় তাকে। মূলত ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনের ডানদিকের রাস্তায় বসেন তিনি। তবে কখনও শেখ রাসেল স্কুলের (পুরাতন) পাশের রাস্তায় আবার কখনও চারুকলাতেও দেখা যায় তাকে। ক্যাম্পাসে বিক্রির ফাঁকে গণেশ নিজেই বাঁশি বাজিয়ে আকৃষ্ট করেন ক্রেতাদের। ‘পিরিত যতন পিরিত রতন পিরিত গলার হাড়…’, ’পিঞ্জর খুলে দিয়েছি, যা কিছু কথা..’সহ বাঁশিতে সুর তোলে নিজের লিখা বিভিন্ন গান শুনিয়ে থাকেন ক্রেতাদের।
ক্যাম্পাসে বাঁশি ব্রিক্রির ফাঁকে কথা হয় গণেশের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাঁশিগুলো নিজেই তৈরি করেন। বাঁশি বিক্রির পাশাপাশি গান লিখেন এবং সুর দিতে পারেন। বিভিন্ন স্কেলের প্রায় ১৩ প্রকারের বাঁশি পাওয়া যায় তার কাছে। সকাল থেকে শুরু করে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থাকেন। তবে যেদিন বিক্রি ভালো হয়ে থাকে সেদিন বেশি সময় থাকেন তিনি। ক্রেতাদের থেকে ভিন্ন ভিন্ন বাঁশির জন্য তিনি বিভিন্ন দাম নিয়ে থাকেন তিনি। ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ বা তারও বেশি হয়ে থাকে। তবে, হাজার টাকার উপরেও বাঁশি সরবরাহ করেন তিনি।
নিজের দূর্দশার কথা উল্লেখ করে গণেশ বলেন, পূর্বে বাঁশি বিক্রি ভাল হতো। তখন স্বাচ্ছন্দে সংসারের খরচ চালাতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে তেমন বিক্রি হয় না। কোন দিন তিনটা আবার কোন দিন পাঁচটা বাঁশি বিক্রি হয়ে থাকে। এ দিয়ে কোনো মতে চলে সংসার। আবার তার সহধর্মিণীর মারাত্মক অসুখ হয়েছে। বর্তমানে শঙ্কায় দিন পার করছেন তিনি। বাঁশি বিক্রির টাকায় যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারছেন না। কোথাও থেকে সাহায্য সহযোগিতা পাননি তিনি।
বাঁশি বিক্রির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে যদিও বিক্রির পরিমান কম হয় তারপরও যে টাকা রোজগার হয় সেটা দিয়েই তিনি পরিবারের ভরণ পোষন করেন। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে বাঁশি সংস্কৃতি থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি বাঙ্গালী সংস্কৃতির এতিহ্য এই বাঁশিকে টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানান তিনি।


প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৩ | সময়: ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর