পাঁচ সিটিতে স্বতন্ত্র আছে বিএনপি?

স্টাফ রিপোর্টার : পাঁচ সিটি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা আছে বিএনপির। তবে সবগুলোতেই স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রার্থী হতে আগ্রহী নেতারা। রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হতে ঘোষণা দেওয়া সাঈদ হাসান বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনকে মোকাবিলা করতে চাওয়া সাঈদ হাসান রাজশাহী বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফার ভাই। তবে বিএনপিতে সাঈদের এখন আর কোনো পদ নেই।
জাতীয় নির্বাচনের আগে গাজীপুর, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও খুলনা সিটি করপোরেশনে ভোট হতে যাচ্ছে। বিএনপি কোথাও প্রার্থী দেবে না জানালেও দলটির সঙ্গে সম্পৃক্তরা স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রার্থী হয়েছেন বা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এর আগেও বিএনপির নেতারা এভাবে ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে নির্বাচন করে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে এবার পাঁচটি সিটি নির্বাচনে ভোটে লড়তে আগ্রহ দেখানো তিন জনের দলে কোনো পদ নেই।
অন্যদিকে সিলেট সিটিতে বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ভোটের ইংগিত দিয়েছেন, যিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। খুলনায় বিএনপির গতবারের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ভোটে আগ্রহী হলেও এখনও স্পষ্ট ঘোষণা দেননি।
রাজশাহীতে এতদিন কারও নাম শোনা যায়নি, যদিও সাঈদ ছাড়াও মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইট এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনকে নিয়ে গুঞ্জন ছিল। ২০১৮ সালের সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। সেবার দলের মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন সুইটও।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকেলে সাঈদ আর আগ্রহের কথাটি সরাসরি প্রকাশ করেন। জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে আসবে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, “নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আছে। আমি সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছি। নির্বাচন করলে দলীয় বাধা আসবে। আবার নির্বাচনে জনগণের রায়ের প্রতিফলন হবে কি না, সেটাও একটা ব্যাপার। সবকিছু মিলিয়ে আমি ভাবছি। পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারব।”
বিএনপি ভোটে নেই, কিন্তু সাঈদ আগ্রহী- এটি কি কোনো কৌশল? এই প্রশ্নে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ আলী ঈসা বলেন, “বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে। সাঈদ তো বিএনপির কমিটিতে নেই। তিনি প্রার্থী হলেও আমাদের কিছু আসে যায় না। আমরা তো ভোটই দিতে যাব না।”
তবে আওয়ামী লীগ মনে করছে, এভাবে, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ দিয়েই তাদেরকে মোকাবেলা করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক পিন্টু বলেন, “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন। আমরা চাই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হোক। এর মানে এই নয় যে বিএনপি নেতা ভোট করবেন আর আমরা ভয়ে ভীত হব।
“অতিতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম বিএনপি প্রকাশ্যে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও ভিন্ন কৌশলে তারা ভোটের মাঠে থাকবে। তাই আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে বলে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছি।”
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনকে, জাতীয় পার্টি মনোনয়ন দিয়েছে দলের মহানগর শাখার আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম স্বপনকে। আর ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা হয়েছে মুরশিদ আলম ফারুকীর নাম।
কে এই সাঈদ হাসান : সাঈদ হাসান আশির দশকে ছাত্র রাজনীতি করতেন। সে সময় তিনি রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। সেই কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিতে সহসভাপতিও (ভিপি) হয়েছিলেন। পরে রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি হন।
২০১১ সালে মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাঈদ হাসান (মিজানুর রহমান মিনু তখন সভাপতি, শফিকুল হক মিলন সাধারণ সম্পাদক) । তবে পরের কমিটিতে জায়গা না পেয়ে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এই বিএনপি নেতা।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর মিনুর পাশাপাশি দলের মনোনয়ন ফরম তোলেন সাঈদ হাসানও। বিএনপি দুজনকেই মনোনয়ন দেয়। পরে মিনুর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হলে সাঈদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
সাঈদের ভাই নাদিম এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনি রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে দুই বার বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।
স্বতন্ত্র আছে বিএনপি : আগামী ২৫ মে গাজীপুরের পর খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে ১২ জুন এবং রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনে ভোট হতে যাচ্ছে ২১ জুন। বিএনপি এই নির্বাচনে না গিয়ে বলেছে, কেউ ভোটে অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দলটি সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে ‘ঘোমটা পরে’ ভোটে যাবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য এসেছে, তারও জবাব দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কোনো কৌলশলেই তারা ভোটে যাচ্ছেন না।
তবে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির ২০১৮ সালের প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের ভাতিজা সরকার শাহনুর ইসলাম রনি। রনির পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। তবে তার কোনো পদ নেই। এই যুক্তি দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নান। রনি বলেছেন, তিনি বিএনপি পরিবারের এবং দলটির তৃণমূল তার পাশেই আছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনে বিএনপির বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রার্থী হবেন কি না, এ নিয়ে আছে জল্পনা কল্পনা। রোজায় লন্ডন সফরে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একটি ইফতার মাহফিলে অংশ নেন আরিফুল। সেখানে তিনি নির্বাচনের বিষয়ে ‘সংকেত’ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ইফতারের আগে দেওয়া বক্তব্যে আরিফুল তখন বলেন, ‘এই সরকারের আমলে দুই দুইবার বিএনপির হয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। কিন্তু এবার যেহেতু আমাদের দল এই স্বৈরাচারী সরকার, ফ্যাসিস্ট সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। সেই ক্ষেত্রে আমরা অটল।
“তবে, একটি কথা বলে রাখতে চাই। আজকে যুক্তরাজ্যে আসছি মাত্র চারদিন, হ্যাঁ, আমার সঙ্গে আমার নেতার (তারেক রহমান) মিটিং হয়েছে। তিনি আমাকে একটা সিগন্যালও দিয়েছেন। সেটা রেড কিংবা সবুজ- সেটা সময়ই বলে দেবে ইনশাল্লাহ। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করব।”
দেশে ফিরে গত ২৮ এপ্রিল জুমার নামাজ শেষে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তিন সপ্তাহ সময় চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দল বিএনপি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কি না, তা আগামী ১৯ বা ২০ মে নগরীর রেজিস্টারি মাঠে জনসভা আয়োজন করে জানিয়ে দেব।
“এখন আমি সচেতন ভোটার, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ মুরব্বিদের মতামত নিচ্ছি। সবার সাথে আলোচনা করে এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ শেষে আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাব।”
বরিশালেও বিএনপির প্রয়াত মেয়র আহসান হাবিব কামালের ছেলে কামরুল আহসান রূপন স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।
রূপন বলেন, বাবা আহসান হাবীব কামালের সঙ্গে যারা রাজনীতি করেছেন, তাদের সহানুভূতি তিনি পাচ্ছেন। অনেকেই সঙ্গেই দেখা করেছেন, কুশল বিনিময় করেছেন।
“যারা মান-অভিমান নিয়ে এতদিন দূরে সরে ছিলেন, তারাও এখন আসছেন। সবার কাছ থেকে অকল্পনীয় সাড়া পাচ্ছি। খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে। সামনে আরও অনেক বড় চমক আছে।”
খুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেককে ফের মোকাবিলায় মুখিয়ে আছেন ২০১৮ সালের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেছেন, “গত সিটি নির্বাচনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকার নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। তবে অনেকে মনে করেন নির্বাচনে যাতে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দিতে না পারে, সে জন্য নির্বাচনে যাওয়া উচিত।”
তাহলে কি ভোটে যাচ্ছেন? মঞ্জু বলেছেন, “দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে আমি যাব না। আমরা অপেক্ষা করছি, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিএনপি হয়ত একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”
খুলনায় চার দশক ধরে বিএনপির রাজনীতি করে আসা মঞ্জু অবশ্য দলে অবস্থান হারিয়েছেন। গত সিটি নির্বাচনের তিন বছর পর ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর থেকে দলে কোণঠাসা তিনি ও তার অনুসারীরা। গত বছর ১ মার্চ মহানগর বিএনপির ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলে সেখানেও মঞ্জুর পাশাপাশি রাখা হয়নি খুলনা সিটির প্রথম দুই নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন পাওয়া মনিরুজ্জামান মনিকে।
বিএনপি ভোট বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে তৈমূর আলম খন্দকার এবং কুমিল্লায় মনিরুল হক সাক্কু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়েন। দুই জনই পরাজিত হন এবং ভোটে দাঁড়ানোয় তাদেরকে বহিষ্কার করে বিএনপি।


প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৩ | সময়: ৪:৩৪ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর