চাঁপাইনবাবগঞ্জে আধিপত্যের লড়াইয়ে অস্থির আ’লীগের রাজনীতি : এমপি-মেয়র কোন্দল চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক : আধিপত্যের লড়াইয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতি। বিশেষ করে গত ১ ফেব্রুয়ারি উপ-নির্বাচনের পর অস্থিরতা বাড়তে থাকে। দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। যার প্রভাবে গত দুই মাসে আওয়ামী লীগের চারজন নেতাকর্মী খুনের ঘটনা ঘটে। আর এ সব হত্যা মামলায় আসামী হয়ে এলাকা ছাড়া শতাধিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই গ্রুপের এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সদস্য মোখলেসুর রহমান।
দলীয় একাধিক সুত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে পৌরসভা নির্বাচনের পর থেকেই মূলত: নানা বিষয়ে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েন আবদুল ওদুদ ও মোখলেসুর রহমান। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বোমাবাজি, হামলা-মামলা চলতে থাকে। সর্বশেষ প্রকাশ্যে যুবলীগ নেতা খায়রুল আলম জেমকে হত্যার পর তীব্র হয় দুই জনের দ্বন্দ্ব।
জেম হত্যাকান্ডের পর এমপি আবদুল ওদুদ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, মেয়র মোখলেসুর রহমানের ইন্ধনেই হত্যা করা হয়েছে জেমকে। জেমকে হত্যা করে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা প্রতিশোধ নিয়েছে। কারণ জেম উপ-নির্বাচনে তার হয়ে কাজ করেছিলেন।’
অন্যদিকে, জেম হত্যা মামলা নিয়ে আবদুল ওদুদ রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ মেয়র মোখলেসুর রহমানের। তার অভিযোগ, জেম হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি আব্দুল ওদুদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও জেলার বিভিন্ন স্থানে থাকা তার বিরোধী পক্ষের আওয়ামী লীগের লোকেদের আসামি করেছেন। এমনকি এমপি আমাকেও বাদ দেয়নি মামলার আসামী থেকে।
এছাড়াও আমর মালিকানাধীন গ্রামীণ ট্রাভেলসের জিএম ও জেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান ছানা ও গ্রামীন ট্রাভেলসের কাউন্টার ম্যানেজার শামসুল হোদা সনি, রানীহাটি ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রহমত আলী, চর বাগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শহিদ রানা টিপু, চর বাগডাঙ্গা ইউপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদেরসহ এমন সব লোকেদের আসামি করা হয়েছে যারা জেমকে চিনতেনও না।
এদিকে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, এই অস্থিরতার দ্রুতই অবসান হওয়া দরকার। দুজন নেতা এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে থাকলে সার্বিকভাবে দলের ক্ষতি হবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অনৈক্যের সুযোগ নিতে পারে অন্য দলগুলো।
জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. গোলাম রাব্বানী মনে করেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব যে প্রকট আকার ধারণ করেছে তার সমাধান হওয়া দরকার। আমি কারও পক্ষে বিপক্ষে বলতে চাইনা। দলের পক্ষে কথা বলতে চাই। দলের স্বার্থেই আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন।’
সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন, ‘একটি বড় দলের দুজন নেতার মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। তাই বলে সেই বিরোধের খেসারত দলকে দিতে হবে, এটা হতে পারে না। সামনে সংসদ নির্বাচন। এ সময়ে দুজন নেতার প্রকাশ্য বিরোধ নিঃসন্দেহে দলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খায়রুল আলম জেম হত্যার মামলায় কিছু নিরপরাধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে জড়ানো হয়েছে এবং এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। এটাও উচিত হয়নি। জেম আওয়ামী লীগ পরিবারেরই সদস্য। তাকে হত্যার ঘটনা সবাইকে মর্মহত করেছে। তাকে হত্যার ঘটনা সবাইকে মর্মাহত করেছে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাক। কোন নিরাপরাদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বা সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হয়।’
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও হত্যাকান্ড আমাদের বিচলিত করেছে। এই ঘটনাগুলো অবশ্যই অনাকাঙ্ফিত। হত্যার ঘটনার পর মামলা হয়েছে এবং মামলা তদন্তধীন রয়েছে। তবে মামলার বাইরে অন্য যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো নিষ্পর্তির জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।’
পুলিশ, দলীয় ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি উপ-নির্বাচনের চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে আবদুল ওদুদ এমপি হওয়ার পর তার অনুসারীরা জেলাজুড়ে বালুমহাল ও হাট-ঘাট দখলসহ নিজের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠে।
এর অংশ হিসেবে পদ্মার বালুঘাট দখলে নিতে সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, কুখ্যাত বোমাবাজ খ্যাত ইসমাইল বকরি ও আজিম মেম্বারের নেতৃত্বে গত ২৪ এপ্রিল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জনতার হাট এলাকায় শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রতিপক্ষ রুহুল মেম্বারের দলবলও পাল্টা বোমাবাজি করেন। বিকেল তিনটার দিকে বোমার আঘাতে জিয়ারুল ইসলাম (৪০) নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। নিহত জিয়ারুল ইসলাম চন্দ্রনারায়ণপুর গ্রামের কসিমুদ্দিনের ছেলে।
এর আগে গত ৯ এপ্রিল সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে কালিনগর বাবলাবোনা গ্রামের মাটি ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ কর্মী মনিরুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মাটি ও বালি ব্যবসার আধিপত্য নিতে প্রতিপক্ষরা তাকে হত্যা করে। কিন্তু জিয়ারুল ও মনিরুল হত্যা মামলায় আসামী করা হয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। যারা এমপি ওদুদ বিরোধী বলে পরিচিত।
এছাড়াও গত ১৩ এপ্রিল জেলার নয়ালাডাঙ্গ ইউনিয়নের নবাব মোড়ে ইউপি মেম্বার আলম আলীকে (৫০) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে এ হত্যাকান্ডের অভিযোগ উঠে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। আব্দুর রহমান এমপি ওদুদ অনুসারী।
এদিকে, গত ১৯ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উদয়ন মোড়ে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে খুন হন খাইরুল আলম জেম ওরফে বোমারু জেম (৫৪)। আলোচিত হত্যাকান্ড ও বিস্ফোরকসহ ১৬ মামলার আসামী জেম খুনের ঘটনায় ৪৮ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪ জনকে।
নিহত খাইরুল আলম জেমের বাড়ি শিবগঞ্জ পৌরসভার মর্দানা গ্রামে। গত দুই বছর ধরে নিজ এলাকা ছেড়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডে নয়াগোলা এলাকায় বসবাস করতেন। থাকতেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ এর ছত্রছায়ায়। আব্দুল ওদুদ এর ছত্রছায়ায় তিনি জেলা যুবলীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদকের পদ পান।
খাইরুল আলম জেম শিবগঞ্জ পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডে একবার কাউন্সিলর ছিলেন। জেম পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে খুন পাল্টা খুন, বোমাবাজি, প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি লুট ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধে জেমের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে। এলাকায় মোমারু জেম নামে পরিচিত খাইরুল আলম জেম সাইফুদ্দিন আহমেদ সাফু হত্যার মুলহোতা ছিলেন। ২০২০ সালের ১৪ জুন জেম ও তার ক্যাডার বাহিনী সাফুকে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
জেম নিজ এলাকা ছেড়ে শহরে আসলেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ত্যাগ করতে পারেননি। এমপি ওদুদের প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বিরোধে জড়ান। গত ১ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে হওয়া উপ-নির্বাচনের আগে ও পরে শহরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় জেমের সম্পৃক্ততা থাকলেও এমপির শেল্টারে থাকায় পুলিশ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।
এদিকে জেম হত্যাকান্ড রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শহরের মধ্যে ঘটলেও এই মামলায় আসামি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মামলায় জেলাজুড়ে হাট, ঘাট মালিক, বালু ব্যবসায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বার থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতা, শিক্ষক-ছাত্র ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ আসামি হয়েছেন। যারা গত উপ-নির্বাচনে স্থানীয় এমপি আব্দুল ওদুদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।
জেম হত্যা মামলায় মুল আসামী করা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মখলেসুর রহমান এবং গত উপ-নির্বাচনে এমপি ওদুদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সামিউল হক লিটনকে। এ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেম হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি আব্দুল ওদুদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও জেলার বিভিন্ন স্থানে থাকা তার বিরোধী পক্ষের লোকেদের আসামি করেছেন। এমনকি এমপি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পৌরসভার মেয়র মোখলেসুর রহমানের মালিকানাধীন গ্রামীণ ট্রাভেলসের জিএম ও জেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান ছানা ও গ্রামীন ট্রাভেলসের কাউন্টার ম্যানেজার শামসুল হোদা সনি, রানীহাটি ইউপি চেয়ারম্যান রহমত আলী, চর বাগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপু, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাদেরসহ এমন সব লোকেদের আসামি করা হয়েছে যারা জেমকে চিনতেনও না।


প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৩ | সময়: ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ