ভাঙ্গছে রাস্তা, বাড়ছে জনদূর্ভোগ : বাগমারায় নদী খননের মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়

মাহফুজুর রহমান প্রিন্স, বাগমারাঃ রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ফকিরানী ও বারনই নামে দুটি নদী পূনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। দেশের ৬৪ জেলার অভ্যন্তরের ছোট নদী,খাল এবং জলাসয় পূনঃখনন প্রকল্পের আওতায় এই খননকাজ শুরু করা হয়। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থ বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহীর আওতায় ফকিরানী নদীর সাড়ে ষোল কিঃমিঃ খনন কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় গত বছরর ৩০ আগষ্ট। পরে একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর কাজ শুরুর কথা থাকলেও নদীতে পানি থাকার কারণে একই বছরের ডিসেম্বরের শেষ নাগাত খনন কাজ শুরু করেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রায় সাড়ে এগারো কোটি টাকা ব্যয়ে চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর এই খনন কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ইতিমধ্যে প্রায় আশিভাগ খনন কাজ শেষ হওয়ায় পথে। এখন মাটি অপসারণের পালা। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে এই মাটি বিক্রি করে দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উভয় দপ্তরের এই নিলাম কাজ করা হয়েছে অনেকটা রাখঢাক করে গোপনীয়তার মাধ্যমে। প্রকাশ্যে নিলামে কেবল ইটভাটার মালিকরাই অংশ গ্রহন করেছে। স্থানীয় মাটি ব্যবসায়ীরা বলছেন, নদী খননের ওই মাটি কিঃমিঃ চুক্তিতে একেবারে পানির দারের চেয়েও কম দামে বিক্রি করা হয়েছে। এখন মাটি গুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নদীর পাড় থেকে প্রায় ৮/১০ কিঃমিঃ দুরের ইটভাটায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি এই মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভাংগাচোরা ট্রাকে করে। এতে রাস্তাতেই প্রায় ১৫/২০ ভাগ মাটি পড়ে রাস্তা একাকার হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ সংলগ্ন স্লুইসগেইট এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক ট্রাকে করে মাটি পরিবহন করতে দেখা গেছে। ভবানীগঞ্জ কলেজ মোড়ের কয়েকজন দোকানী জানান, সকাল থেকেই তারা এভাবে মাটি নিয়ে যেতে দেখছেন। তারাও ট্রাক চালককে জিজ্ঞাসা করে জেনেছেন মাটি গুলো উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওই মোড়ের পথচারীসহ ভ্যান চালক ও অটোচালকরা জানান, প্রায় অর্ধশতাধিক লক্করঝক্কর ট্রাকে করে মাটি পরিবহন করার ফলে অনেক মাটি রাস্তায় ঝরে পরছে। এতে পথচারী সহ বিভিন্ন যানবাহনের চরম দূর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে দূর্ঘটনাও। মঙ্গলবার এই মাটি পরিবহনের সময় ট্রাকটরের মাটি পড়ে রাস্তা নষ্ট হওয়ায় ভবানীগঞ্জ গোড়াউন মোড় এলাকায় মোটরসাইকেল স্লিপ করে দুইজন মারাত্বক আহত হন। ওই মোড়ের ভ্যান চালক, সিএনজি চালক সহ বিভিন্ন যানবাহনের প্রায় ২০/২৫ জন চালক জানান, এই সমস্ত মাটির ট্রাকের কারণে তারা রাস্তায় নামতেই পারছেন না। ট্রাক চলার সময় ঝরঝর করে মাটি পড়ে সেখানে রাস্তার বারোটা বেজে যাচ্ছে। আর এসব ট্রাক চালকদের গতি খুবই বেপরোয়া। তারা নেশাগ্রস্থের মত ব্যাপক গতিতে মাটি পরিবহন করায় রাস্তায় এক ভীতির সৃষ্টি হয়। স্কুলগামি ছেলেমেয়েরাও এসব বেপরোয়া গতির ট্রাকের কারণে রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছে। অভিভাবকরা বলছেন এসমস্ত ভাংগাচোরা ট্রাকের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দূর্ঘটনা। বিষয়টি উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে সবার চোখের সামণে ঘটে চললেও সবাই মুখ ফিরিয়ে থাকছেন।
বেআইনী,অবৈধ এসব ট্রাকে করে ওভারলোড মাটি পরিবহনের কারণে একদিকে যেমন জনদূর্ভোগের সুষ্টি হচ্ছে। অপরদিকে এসব মাটির ট্রাকের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তা ভেঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে। শুধু এই মাটির ট্রাকের কারণে উপজেলার শিকদারী-তাহেরপুর ও ভবানীগঞ্জ হামিরকুৎসায় যোগাযোগ স্থাপনকারী নবনির্মিত রাস্তা ভেঙ্গে আগের পর্যায়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা জানান, শুধু এই দুটি রাস্তাই নয়। ট্রাকে মাটি পরিবহনের কারণে উপজেলার চলতি বছরেই সংস্কারকৃত অন্তত ১০/১২টি রাস্তা বছর না ঘুরতেই ভেঙ্গেচুরে চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এসব রাস্তার মধ্যে রোডস এ্যান্ড হাইওয়ে, ভবানীগঞ্জ পৌরসভা ও এলজিইডি’র রাস্তা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সহকারি প্রকৌশলী লিটন মিয়া বলেন, পৌরসভার রাস্তাগুলো আমরা ভালো রাখতে চাই। কিন্তু আমাদের কথা ওরা(মাটির ট্রাক মালিক ও চালকরা) আমলেই নিতে চায় না। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন কে অবহিত করা হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী খলিলুর রহমান মাটির ট্রাকের কারণে তার দপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রাস্তার ক্ষতি হবে এসব যানবাহনে মাটি পরিবহন করলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। তাদের বিরুদ্ধে চিঠি ইস্যু করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহীর জেলার উপসহকারি প্রকৌশলী সুকেশ কুমার জানান, সরকারি কাজের মাটি সরকারি ভাবে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। তবে এই মাটি পরিবহনে জনদূর্ভোগ ও রাস্তার ক্ষতি সাধন না করে পরিবহন করতে হবে। একই দপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ওবায়দুল ইসলাম জানান, নদী খনন ঠিকমত হচ্ছে কিনা আমরা এটা দেখভাল করি। মাটির নিলাম ও পরিবহনের বিষয় সংশ্লিষ্ট উপজেলার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রায় একই অভিমত ব্যক্ত করে পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, খননসহ মাটির স্থানান্তর সবকিছুই ঠিকভাবে করতে হবে। সামনে বর্ষ মৌসুম। বৃষ্টিতে পড়ের মাটি পড়ে আবার যেন নদী ভরাট হয়ে না যায় আমরা সেই দিকে লক্ষ রেখে দ্রুত মাটিগুলো স্থানান্তর করার চেষ্টা করছি। তবে এই কাজে যেন কোন জনদূর্ভোগ ও রাস্তার ক্ষতি না হয় তা সঠিক ভাবে দেখার জন্য ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার পরও বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখবো । এ বিষয়ে উপজেলা পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ,এফ,এম আবু সুফিয়ান জানান, রাস্তার ক্ষতি সাধন ও জনদূর্ভোগ দুুটোই গুরুত্বপূর্ন বিষয়। অচিরেই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে এর একটা সুরাহা করার চেষ্টা করব ।


প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৩ | সময়: ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ