কৃষি আবহাওয়ার তথ্য বোর্ড আছে, তথ্য নেই

নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁয় কাজে আসছে না কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস তথ্য বোর্ড। জেলার ১১টি উপজেলার ৯৯টি ইউনিয়নে তথ্য বোর্ড থাকলেও তথ্য হালনাগাদ করা হয় না। চার বছর আগে স্থাপন করার পর থেকেই সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে রয়েছে। যন্ত্রগুলো এবং তথ্য বোর্ড পড়ে থাকার ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা।
এর আগে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশজুড়ে কৃষি আবহাওয়া তথ্যপদ্ধতি উন্নতিকরণ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এর অংশ হিসেবে জেলার ১১টি উপজেলার ৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে কৃষকদের আবহাওয়ার আগাম তথ্য জানাতে বসানো হয় আবহাওয়া তথ্য বোর্ড। তবে আবহাওয়া যাই থাক না কেন, বোর্ডের তথ্যের আর পরিবর্তন হয় না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষি আবহাওয়া বোর্ডগুলো ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে নামমাত্র স্থাপন করা হয়েছে। রেইনগেজ মেশিন ও সোলার প্যানেলগুলো স্থাপন করা হয়েছে ছাদে। এ বোর্ড থেকে কৃষকরা নিয়মিত কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও তা পাচ্ছেন না। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে ডিসপ্লে বোর্ড, সোলার প্যানেল ও রেইনগেজ মেশিনগুলো। কোথাও কোথাও আবার খুলে রাখা হয়েছে।
ডিসপ্লে বোর্ডে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতার হার, বায়ুপ্রবাহ, দিনের আলো কতক্ষণ থাকবে ও ঝড়ের পূর্বাভাসসহ মোট ১০টি তথ্য দেওয়ার ছক রয়েছে। আর ওই ছকের তথ্য থেকেই তিনদিন আগের ও তিনদিন পরের আবহাওয়ার আগাম তথ্য জানতে পারবেন কৃষকরা। কিন্তু বোর্ড স্থাপনের পর থেকে তার কোন কার্যক্রম নাই। ফলে সরকারের এ প্রকল্পটির মুখ থুবরে পড়তে চলেছে। এতে করে একদিকে যেমন কৃষকরা এ প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে না অন্যদিকে নষ্ট হতে চলেছে এর উদ্যেশ্য।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সরকার এমন একটি প্রকল্প হাতে নিলেও অধিকাংশ কৃষকরা জানেন না এ ব্যপারে। তাদেরকে কেউ এ বিষয়ে কোনদিন অবগতই করেনি। তারা এই বোর্ড থেকে কখনো এসব তথ্য জানতে পারেননি।
সদর উপজেলার বর্ষাইল ইউনিয়নের কৃষক ইসরাফিল জানান, তারা সবজিসহ অন্যান্য ফসলের চাষ করেন। একটু খরা বা বৃষ্টি হলেই ক্ষতি। একারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। আগাম তথ্য পেলে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া যেতো।
সদর উপজেলার শৈলগাছী এলাকার কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, সরকার এমন একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে অথচ আমরা জানি না।
রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের কুনৌজ গ্রামের কৃষক আশরাফুল বলেন, ঝড়-বৃষ্টি, খরা, শীত, কুয়াশার তথ্য যদি আগে পেতাম তাইলে আমাদের ক্ষতি কম হতো।
আরেক কৃষক ময়নুল মন্ডল বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য বোর্ডের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার বিষয়ে তরা কিছু জানেন না। এমন তথ্য তারা কখনো পাননি। তবে এ রকম তথ্য দেওয়া হলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের ফসল কিছুটা হলেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। তাই এই যন্ত্রগুলো দ্রুত চালুর দাবি জানান তিনি।
ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদিগুন এলাকার কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, আগে থেকে আবহাওয়ার সংবাদ জানতে পারলে আমাদের অনেক উপকার হতো। কিন্তু তা জানার ব্যবস্থা নেই।
সদর উপজেলার কীর্তপুর ইউনিয়ন ব্লকের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা খাজা মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান বলেন, এটি স্থাপনের কিছুদিন সচল ছিল। এরপর থেকে আর ব্যবহার করা যায়নি। তবে এটি ব্যবহার করা করা গেলে স্থানীয় কৃষকরা আবহাওয়ার আগাম তথ্য জানাতে পারবে।
বক্তারপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদ ব্লকের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যখন কোন বড় ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগের বিষয় আসে তখন আবহাওয়া অফিস থেকে জেনে ওই বোর্ডে কলম দিয়ে লিখে দেওয়া হয়। তবে ডিসপ্লে বোর্ডের যেসব পয়েন্ট আছে সেগুলোর কোন কাজ করা হয় না। কারণ এ বিষয়ে আমাদের কোন প্রশিক্ষণ নাই।
একই ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুল মতিন বলেন, কৃষি আবহাওয়া পূর্বাভাসের বোর্ড থাকলেও কখনো আপডেট এবং কার্যক্রম করা হয়নি। এমনকি এ নিয়ে কখনো কোন সভায় আলোচনাও হয়নি। তবে এ বোর্ড চালু করা হলে কৃষকদের জন্য সুবিধা হবে।
ধামইরহাট উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বদিউল আলম বলেন, কৃষি আবহাওয়া পূর্বাভাসের বোর্ড স্থাপনের পর থেকেই এর কার্যক্রম চোখে পড়েনি। যেভাবে স্থাপন করা হয়েছে ওভাবেই পড়ে আছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু হোসেন বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে ‘কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্পের’ আওতায় কৃষকদের কৃষি আবহাওয়া পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য পূর্বাভাস বোর্ড ও রেইন গেজ মিটার স্থাপন করা হয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতি। এখানে প্রতিদিনের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং কৃষকদের করণীয় কি আমাদেরকে ওয়েবসাইট থেকে নিয়ে বোর্ডে লেখার কথা। যেহেতু এইটা ম্যানুয়াল, লাগানোর সময় ঠিকই ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ওইভাবে গুরুত্ব না দেওয়ায় কম ব্যবহার হয়।
তিনি আরও বলেন, এ প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান আছে। আমি এখানে আসার পর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে যখন গিয়েছি তখন তাদের বোর্ডটি সচল করার জন্য বলেছি। এছাড়াও উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদেরও বোর্ডে তথ্য লেখার জন্য বলা হয়েছে। আশা করছি সরকারের যেহেতু এটি একটি ভালো প্রকল্প এবং আমাদেরকে আধুনিক কৃষির দিকে যেতে হবে তাই এটা পর্যায়ক্রমে আরো উন্নত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত এখান থেকে কৃষক তথ্য পাবেন।


প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৯, ২০২২ | সময়: ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর