সাফল্য অর্জনকারী ৫ জয়িতার গল্প

রুবেন্স চৌধুরী, পত্নীতলা: জয়িতা হচ্ছে সমাজের সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল নারীর একটি প্রতিকী নাম। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দিক নির্দেশনায় ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রতিবছর দেশব্যাপী “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” শীর্ষক অভিনব প্রচারাভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃণমূলের সফল নারী, তথা জয়িতাদের অনুপ্রাণিত করা। এরি ধারাবাহিকতায় সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলায় ২০২২ সালে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিশেষ সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ জয়িতা হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন ৫ জন আত্মপ্রত্যয়ী এবং সংগ্রামী নারী। তারা হলেন-
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ জয়িতা সবিতা রাণী: সবিতা এস.এস.সি পাশের পর পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয় উপজেলার রায়গঞ্জ গ্রামে প্রকাশ চন্দ্র এর সাথে। সংসারের আর্থিক দূরাবস্তা দেখে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন, এরি মধ্যে সবিতার কোল আলো করে জন্ম নেয় ১ কন্যা সন্তান। প্রাইভেট পড়নোর উপার্জিত সঞ্চয় দিয়ে স্বামীর চায়ের দোকানে রুটি, পরোটা বিক্রির পাশাপাশি বাড়ীতে ছাগল এবং গরু লালন-পালন করেন। এসময় ২য় কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। ব্যবসার মুনাফা এবং গরু বিক্রি করে রায়গঞ্জ বাজারে ১টি দোকান কিনেন। সেখানে পরোটা, রুটি, সিঙ্গাড়া, পুরি ও বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি বিক্রি শুরু করেন। বর্তমানে সবিতার বড় মেয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল) এবং ছোট মেয়ে এইচএসসি তে পড়ালেখা করছে। এছাড়া সবিতা এলাকায় নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া সহ হাসপাতালে গিয়ে বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রকৃত ব্যক্তিকে পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগীতা, বাল্য বিয়েতে নিরুৎসাহিত করা, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরে আনতে সহযোগিতার মতো কাজ করে আসছেন। বর্তমানে তিনি পরিবার ও আত্মীয় স্বজন নিয়ে সামাজিকতা বজায় রেখে স্বচ্ছল ভাবে জীবন যাপন করছেন।
শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ জয়িতা মাহবুবা খাতুন: রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা গ্রামের আব্দুল কাদের ও ফাতেমা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান মাহবুবা খাতুন। পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে নবম শ্রেণীতে পড়া সময় এক মসজিদের ইমামের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই ধর্মীয় অনেক গোঁড়ামির কারণে শ্বশুর বাড়ীতে তাকে নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এসব প্রতিকূলতার মাঝেই পিতা-মাতার আর্থিক সহায়তায় ২০০৩ সালে এসএসসি পাস করেন, এসময় তিনি পুত্র সন্তানের মা হন। সংসার, বাচ্চা দেখাশুনা, পড়ার চাপ, স্বামীর অসহযোগিতার মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন এবং স্বামীর অনেক বাধা সত্ত্বেও ২০১০ সালে বিএসসি পাশ করে গণিত বিষয়ে ২০১৩ সালে নিবন্ধন পাশ করেন। ২০১৪ সালে ভূঞাগাঁতী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৭ সালে বিএড কোর্স সম্পন্ন করেন এবং পরে এমএড কোর্সও সম্পন্ন করেন। ২০১৮ সালে এ টু আই কর্তৃক আইসিটি ফর-ই (ওঈঞ৪ঊ) সিরাজগঞ্জ জেলা এম্বাসেডর নির্বাচিত হন এবং শিক্ষক বাতায়নে সেরা কনটেন্ট নির্মাতা নির্বাচিত হন। তিনি নিয়মিত শিক্ষক বাতায়ন, কিশোর বাতায়নে কনটেন্ট আপলোড এবং ব্লগ লিখেন। মুক্ত পাঠের বিভিন্ন কোর্স থেকে ১০০টি সার্টিফিকেট অর্জন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের জন্য দুস্থ অসহায় নারীদের নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে পথ চলা সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে দরিদ্র অসহায় নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে, বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন, স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
সফল জননী ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ জয়িতা লাল মনি ওরাও: রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নে বাঁশাইল গ্রামের বাসিন্দা লাল মনি ওরাও এর অল্প বয়সে বাঁশাইল গ্রামের মোহন উরাও এর সাথে দ্বিত্বীয় স্ত্রী হিসাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর লালমনির কোল জুড়ে দুই মেয়ে এবং এক ছেলে সন্তানের জন্ম নেয়। সন্তানরা ছোট থাকা অবস্থায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়। এসময় সংসার চালাতে দিশেহারা হয়ে পড়েন লালমনি। ইচ্ছো না থাকা সত্ত্বেও বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে হয়। শুধু মাত্র বাড়ী ভিটা ও আবাদী কয়েক শতক জমি দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হওয়ায় দিন মজুরের কাজ করতে হয় লালমনিকে। এ সময় অনেক দিন অনাহারে কাটলেও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যান তিনি। স্কুল ছুটির দিনে তার ছেলে তার সাথে দিন মজুরের কাজ করতো। অনেক কষ্টে তিনি ফরম পূরণের টাকা যোগাড় করে ছেলেকে এসএসসি পরীক্ষায় বসান। তার ছেলে ভাল ফলাফল করলে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। এসময় তাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু আজ তার জীবন স্বার্থক হয়েছে। বর্তমানে তার ছেলে নোয়াখালীতে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকুরীরত আছে। তাকে এখন দিন মজুরের কাজে যেতে হয়না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে তার ছেলে। তিনি এখন খুব খুশি। তার মত মায়েরা অনেক বাধা পেরিয়ে যেন তাদেরও সন্তানদের মানুষ করে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এটাই লালমনির সকল মায়েদের কাছে প্রত্যাশা।
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করা শ্রেষ্ঠ জয়িতা আমিনা খাতুন: আমিনা খাতুন রফিকুল ইসলাম ও তারা ভানুর আট সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান। ১০ম শ্রেণীতে পড়ার সময় পাঁচলিয়া নিবাসী মোহসিন সরকারের সহিত তার বিয়ে হয়। বিয়েতে তার বাবা ১ ভরি স্বর্ণ ও ৬০ হাজার টাকা যৌতুক দেয়। বিয়ের ৬ মাস ভালো গেলেও যখন সে সন্তান সম্ভাবা তখন তার স্বামী বিদেশ যাবার জন্য দুই লক্ষ টাকা দাবি করে। স্বামীর আজ্ঞা ও সংসারে অর্থনৈতিক সাফল্যের আশায় শত কষ্টেও পিতার কাছ থেকে স্বামীকে টাকা যোগাড় করে দেন। কিন্তু শাশুড়ী, ননদ ও ননদ জামাই এর অনুপ্রোরচনায় সেই টাকা দিয়ে নেশায় জড়িয়ে পড়ে তার স্বামী। সেই থেকে তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু এবং আরো যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের মাত্রা যখন অসহনীয় পর্যায় তখন সে স্বামী সংসার ত্যাগ করে বাবার বাড়ি চলে আসেন। সেই থেকে ৮ বছরের ছেলেকে নিয়ে আমিনার সংগ্রাম জীবন শুরু। অন্যের বাড়িতে তাঁতের কাজ করা, ছেলেকে ভালভাবে লেখাপড়া শেখানো, বাড়িতে ছাগল পালন ও গরু পালন করে আশা‘এনজিও’তে ডি.পি.এস করা এসবই হয়েছে। নেশাগ্রস্থ নির্যাতনকারী স্বামী সংসারে ফিরে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞায় অটল থাকার মানসিকতা আমিনাকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা শ্রেষ্ঠ জয়িতা সালমা খাতুন: রিকশাচালক বাবার পরিবারের ৫ ভাইবোনের দারিদ্রের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠা সালমা খাতুনের ছোট বয়সেই মা মারা যায়। অভাবের সংসারে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় গোলাম মোস্তফার সাথে তার বিয়ে হয়। ১৫ বছর বয়সে কন্যা সন্তানের মা হন। নিজ প্রচেষ্ঠায় লেখাপড়া চালিয়ে যান, পাশাপাশি মেয়েকে লালন পালন করতে থাকেন। ২০১৫ সালে গুড নেইবারস নলকা মহিলা সমবায় সমিতি লি: এর সাথে জড়িত হন। বর্তমান তিনি গুড নেইবারস মহিলা সমবায় সমিতির লি: এর সম্পাদক পদে রয়েছেন। তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সমিতির মুলধন, ঋণ বিতরণ, বিভিন্ন আয় বৃদ্ধি মূলক গ্রুপ গঠন ও সমিতির সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। সমিতি পরিচালনা করে তিনি প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা আয় করেন যা তার লেখাপড়া ও পরিবারের জন্য সহায়ক হিসাবে কাজ করছে। পাশাপাশি তিনি নিজ প্রচেষ্টায় সিরাজগঞ্জ ইসলামিয়া সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে সম্মান ২য় বর্ষে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন সচেতনতা মূলক কার্যক্রম যেমন-বাল্য বিবাহ, শিশু শ্রম রোধে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহন, গ্রামের মহিলাদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু নিয়ে সভা পরিচালনা করেন। যেহেতু তিনি তার নিজ জীবন দিয়ে সমাজের করুণ চিত্র দেখেছেন। তাই তার ইচ্ছে যেন অন্যরাও তাদের নিজেদের জীবন ও পরিবারকে ভাল অবস্থানে নিতে পারে।


প্রকাশিত: নভেম্বর ১২, ২০২২ | সময়: ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ