সর্বশেষ সংবাদ :

শাহরিয়ারের মৃত্যু ও উদ্ভূত পরিস্থিতি : রামেকের দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে দুষলো রাবি প্রশাসন

রাবি প্রতিনিধি: গত ১৯ অক্টোবর আনুমানিক রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ ও শহীদ হবিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এস জে এম শাহরিয়ার হলের তৃতীয় তলা থেকে নিচে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সযোগে চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত শাহরিয়ারকে সেসময় আইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠান। ঐ ওয়ার্ডে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডাকাডাকির প্রায় আধঘন্টা পর চিকিৎসক ও নার্স আহত শাহরিয়ারের কাছে আসেন। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না দিয়ে চিকিৎসক ও নার্স নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তাঁরা শাহরিয়ারকে মৃত ঘোষণা করেন। শাহরিয়ারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হতবিহ্বল সহপাঠী ও বন্ধুরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পৌঁছায় এবং কর্তব্যে অবহেলাজনিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে থাকে।
সেই সময় ৮ নম্বর ও তার আশপাশের ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স, ব্রাদার, আনসার ও তাদের উচ্ছৃঙ্খল সহযোগীরা ন্যক্কারজনকভাবে শোকার্ত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় লাঠি এবং শল্যচিকিৎসায় ব্যবহৃত ধারালো যন্ত্রপাতি দিয়ে তারা আনুমানিক শতাধিক শিক্ষার্থীকে হাতে, পিঠে, মাথায় আঘাত করে গুরুতর আহত করে। আহত শিক্ষার্থীদের অনেককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্র, বারিন্দ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ রাজশাহীর অন্যান্য হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, ছাত্র-উপদেষ্টা এবং মার্কেটিং বিভাগের সভাপতিসহ ঐ বিভাগের শিক্ষকদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাসপাতালের কতিপয় ব্যক্তির অসহিষ্ণু ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ যাতে তৈরি না হয় সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত শাহরিয়ারের মৃত্যু এবং হাসপাতালের অনাকাঙ্খিত ঘটনার তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করে। এমনকি মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হবার পর পরই সেই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মতিহার থানায় একটি অভিযোগ করে যা পরবর্তীতে অপমৃত্যুর মামলা হিসাবে থানা গ্রহণ করে। সঠিক ঘটনা উদঘাটন ও পরিস্থিতি উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের কোনো ঘাটতি ছিলো না।
এদিকে ঘটনার দিন রাতে পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের যৌথ বৈঠকে ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বৈঠকে গঠিত কমিটির সভা আহ্বানের আগেই পরবর্তী দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করে।
একদিকে চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং নার্সসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থীর আহত হওয়া (আহতদের কেউ কেউ এখনও আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে), আবার ঘটনার দিনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের আলোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করায় পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শাহরিয়ারের মৃত্যু ও শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ন্যায়বিচার চেয়ে রাজপাড়া থানায় অভিযোগপত্র জমা দেয়।
অন্যদিকে রাজশাহীর একজন জনপ্রতিনিধি শিক্ষার্থী শাহরিয়ারকে হত্যা করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, এবং শাহরিয়ারের পরিবারকে হুমকি দিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে পালিয়ে যাওয়াসহ হাসপাতালে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে গণমাধ্যমে অমূলক তথ্য প্রদান করেছেন। এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও সংবাদ থেকে জনপ্রতিনিধির বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গোচরীভ’ত হয়েছে। তিনি অনাকাঙ্খিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ষড়যন্ত্রকারী ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে জনপ্রতিনিধির বাস্তবজ্ঞানহীন ও উষ্কানিমূলক বক্তব্য কোনোভাবেই কাঙ্খিত নয়। দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ও সামগ্রিকভাবে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং রাজশাহী শহরে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে- এমন বক্তব্য কোনো দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির নিকট থেকে আশা করা যায় না। তাঁর বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করার চেয়ে তা আরো জটিল করেছে। প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে এবং ঘটনার খন্ডিত অংশকে ব্যবহার করে তিনি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষানগরী রাজশাহী এবং সমগ্র দেশ তথা মুক্তিযুদ্ধের সরকারকে বিব্রত করেছেন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্ট পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করে তিনি পরিস্থিতি উত্তরণে ভূমিকা রাখতে পারতেন, এমন কোনো উদ্যোগ তার পক্ষ থেকে লক্ষ্য করা যায়নি। প্রশ্ন হলো, তাঁর বক্তব্য অনুসারে শাহরিয়ার যদি পূর্বেই মারা গিয়ে থাকে তবে তার লাশ জরুরি বিভাগ থেকে লাশঘরে না রেখে চিকিৎসার জন্য ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠানো হলো কেন? তার শরীরে কেন স্যালাইন পুশ করার ও অক্সিজেন দেবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো?
শাহরিয়ারের লাশ গ্রহণের ক্ষেত্রে তার পরিবারের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা (মৃতের বড় ভাই) কোনো ধরণের অভিযোগ বা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ গ্রহণ করে। ডাক্তাররা যদি এতটাই নিশ্চিত থাকেন যে, শাহরিয়ারকে পূর্বেই হত্যা করা হয়েছে তবে হত্যা ও পূর্বরাত্রীর ঘটনাবলীর কথা বিবেচনা করে কেনো বিনা ময়নাতদন্তে লাশ হস্তান্তর করলেন? লাশ হস্তান্তরের দায়দায়িত্ব ছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সকলের সহযোগিতায় নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের ধারক এবং এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একক মালিক হিসেবে দাবী করে রাজশাহীর সেই জনপ্রতিনিধি শুধু নিজেকেই হেয় করেননি বরং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীলতায় বিশ্বাস করেন এমন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শিক্ষার্থীদের সবাইকে মর্মাহত ও অপমাণিত করেছেন। যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও দেশের ক্রান্তিকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক ভূমিকা পালনের গৌরবময় অতীতের বিষয়টি তিনি একেবারেই ভুলেই গেছেন। এমনকি জোহা স্যার ও স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের রক্তস্নাত মতিহার ক্যাম্পাসকে তিনি হেয় প্রতিপন্ন করেছেন।
অপরদিকে, চিকিৎসাপ্রার্থী অসহায় মানুষদের প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, ইন্টার্ন, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপর হামলা-মারধরের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে সেগুলো প্রচারিত/প্রকাশিত হয়। একজন চিকিৎসাপ্রার্থীর সাথে কোনো চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের অসংগত আচরণ কখনোই কাম্য নয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। উভয়পক্ষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৌহাদ্যপূর্ণ নিরসন করা সম্ভব হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকলের সহযোগিতা কামনা করছে।


প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২২ | সময়: ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ