প্রাণনাশের ভয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন রাবি শিক্ষার্থী

রাবি প্রতিনিধি: মারধর ও নির্যাতনের শিকারের পর প্রাণনাশের ভয়ে পরীক্ষা না দিয়েই ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়িতে চলে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থী। গত ১৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তাকে নির্যাতন করা হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী। এরপর ক্যাম্পাসে না ফিরে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে অভিযোগপত্র পাঠিয়েছেন ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী।
এ ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন, মার্কেটিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মুমিনুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও মতিহার হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা। অপরদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মো. আল-আমিন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি শরীয়তপুর সদরে। তার চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে। ১৭ আগস্ট ছিল প্রথম পরীক্ষা।
লিখিত অভিযোগে আল-আমিন বলেছেন, তিনি ১৭ আগস্ট পরীক্ষায় অংশ নেন। বিকেল সাড়ে চারটায় পরীক্ষা শেষে বের হওয়ার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও মতিহার হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা তাঁকে রবীন্দ্রভবন থেকে বঙ্গবন্ধু হলের ৩৩১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর সেখানে মুমিনুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ ওরফে শশী, তাকি আহমেদসহ অনেকে আসেন।
লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, মার্কেটিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মুমিনুর রহমান, ফয়সাল আহমেদ শশী ও তাকি আহমেদের সঙ্গে কয়েক মাস ফ্রিল্যান্সিং ‘ডিজিটাল মার্কেটিং’-এর কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু মনোমালিন্য হওয়ায় বছরখানেক আগে তিনি কাজ ছেড়ে দেন। এ কাজের জন্য তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিপত্র ছিল না।
অভিযোগপত্রে আল-আমিন বলেন, মুমিনুর তার মাথায় দুই লিটার পানির বোতল ও লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। তিনি একপর্যায়ে অচেতন হয়ে যান। এ সময় তার মুঠোফোন থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেন তারা। জ্ঞান ফেরার পর রাত আটটার দিকে জোরপূর্বক তার ডেবিট কার্ড নিয়ে গিয়ে ৪৫ হাজার টাকা তোলেন সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত ও ভাস্কর সাহা।
মুমিনুর ও তার অনুসারীরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। তারা জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন এবং সেটির ভিডিও ধারণ করেন। তারা হুমকি দিয়ে বলেন, তাদের কথার বিপক্ষে কোনো কথা বললে এবং কোনো পদক্ষেপ নিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। তাই তিনি জীবন বাঁচানোর জন্য তারা যা বলেছেন, তাই করেছেন তিনি।
আল-আমিন অভিযোগে আরও উল্লেখ করেছেন, তাকে ভয় দেখিয়ে স্টাম্প পেপারে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু তার বোন জাতীয় জরুরি নম্বরে (৯৯৯) কল করার পর পুলিশ আসায় স্বাক্ষর নিতে পারেননি। ওই হলে অন্য একটি ঘটনায় সাংবাদিক, পুলিশ ও অন্যরা এলে রাত নয়টার দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে রাতেই জীবন বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে শরীয়তপুরে চলে যান তিনি। এখনো তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।
আল-আমিন বলেন, আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গেছি। কিন্তু এরা যে আমাকে মারধর করবে তা কখনও আমি ভাবতেই পারিনি। মারধরের পর থেকে আমি আমার বাম কান দিয়ে শুনতে পাচ্ছি না। মাথাতেও গুরুতর আঘাত পেয়েছি। আমার পরীক্ষার প্রবেশপত্র তাদের কাছে আছে। আমি অনেক শংকায় আছি। রাজশাহীতে আসতে না পারায় আমি কুরিয়ারের মাধ্যমে অভিযোগ পাঠিয়েছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার বিচার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে মুমিনুর রহমান বলেন, আল-আমিনসহ আরও কয়েকজনকে আমি চাকরি দিয়েছিলাম। প্রতিমাসে তাকে দেড় লক্ষ টাকা বেতন দিতাম। সে এক-দেড় বছর চাকরি করার পর বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলে চলে যায়। কিন্তু তারা কয়েকজন গিয়ে আরেকটি কোম্পানি চালু করে আমার কোম্পানির ক্লায়েন্টদের নিয়ে নেয়। আমি এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তার বন্ধুদের সামনে তাকে ডেকেছিলাম। তাকে কোনো ধরণের মারধর আমি করিনি। এ বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু ভাইয়ের সামনে আল-আমিন দুঃখপ্রকাশ করেছে।
টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেখানে আমিই তাকে প্রতিমাসে বেতন দিতাম। এখনও অনেককে দিই সেখানে এই কয়েকটা টাকা নিয়ে আমি কি করব!
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত বলেন, আল-আমিন সবার সামনে তার ভুল স্বীকার করেছিল এবং ক্ষতিও পুষিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেখানে তার বন্ধুরাও ছিল। এসময় তো তাকে মারধর করার কোনো প্রশ্নই আসে না। আর তার ডেবিট কার্ড থেকে টাকা নিতে গেলে তো পাসওয়ার্ড জানা লাগবে, ব্যাংকে যেতে হবে! সেখানে টাকা নেওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
মতিহার হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর সাহা বলেছেন,‘হ্যা, এটা সত্য যে সেদিন মুমিনুর ও আল-আমিনের মধ্যে ব্যবসায়িক একটি বিষয়ে আলোচনার সময় আমরা কয়েকজন উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু ওকে কোনো ধরনের মারধরও করা হয়নি এমনকি টাকাও কেড়ে নেওয়া হয়নি। এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। নিশ্চয়ই আমার বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করছে।’
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, আমি ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছি। আমার মনে হয় অভিযোগটি সত্য নয়। ঘটনার এতদিন পরে সে এই অভিযোগটি কেন করল তা আমার জানা নেই। তারপরেও আমাদের ছাত্রলীগের কারও বিরুদ্ধে যদি মারধর এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয় আমরা তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, এ ধরনের একটি অভিযোগ কুরিয়ারের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে পৌঁছেছে। এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি।


প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২২ | সময়: ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ