গোদাগাড়ীতে অকেজো তিন হাজার ৫৪৯ টিউবওয়েল

সেলিম সানোয়ার পলাশ, প্রেমতলী: ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত গোদাগাড়ীতে টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। ফলে ৩ হাজার ৫৪৯ টি টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়েছে। সরকারী মোট ৫ হাজার ১৬৬ টি টিউবওয়েলের মধ্যে ৩ হাজার ৫৪৯ টি টিউবওয়েল অকেজো।
এতে করে ঝুকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। যে টিউবওয়েল গুলো সচল আছে তাতে পানি উঠার পরিমান কমে গেছে। পানির চাহিদা মেটানোর জন্য সাবমার্সিবল পাম্পের দিকে ঝুকছে এ অঞ্চলের সাধারন মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সংকট তীব্র রূপ ধারণ করে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার জন্য বৃষ্টিপাত কম হওয়া, মরণ বাঁধ ফারাক্কা ও বিএমডিএ’র গভীর নলকুপকে দায়ি করছে বিষেশজ্ঞরা।
বিষেশজ্ঞদের মতে ফারাক্কা বাঁধের কারনে পদ্মা নদীতে পানি থাকেনা। এমন কি খরা মৌসুমে পদ্মা নদীর বুক জুড়ে ধু-ধু বালুচর। এছাড়াও গোদাগাড়ীতে বিএমডিএ’র রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৩৩টি গভীর নলকূপ। কৃষিকাজের মৌসুমে ভূ-উপরের পানির যোগান না থাকায় এই গভীর নলকূপগুলো অবিরাম ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে যাচ্ছে। সে অনুপাতে বৃষ্টিপাতও হচ্ছে না। এতে ভূ-গর্ভে পানির রিচার্জ হচ্ছে না। প্রতিনিয়তই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে। ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলে।
গোদাগাড়ী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলার গোদাগাড়ী ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৮৫ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৯৫ ফুট, মোহনপুর ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৮৯ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৯০ ফুট, পাকড়ী ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৯০ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৯১ ফুট, রিশিকুল ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৮০ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৯৫ ফুট, গোগ্রাম ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৮৬ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৯০ ফুট, মাটিকাটা ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৭৭ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৯৭ ফুট, দেওপাড়া ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৮০ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৮১ ফুট, বাসুদেবপুর ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৬৫ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৮৫ ফুট, চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে ২০১৯ সালে পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ছিল ৩৫ ফুট, ২০২২ সালে নিচে নেমে হয়েছে ৩৬ ফুট। তবে এ উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর এলাকায় পানির সর্বনিম্ন স্থিতিতল ১০৫ ফুট।
গোদাগাড়ী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০২২ সালের সুত্র মতে, এ উপজেলার গোদাগাড়ী ইউনিয়নে মোট ৬২৭ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ২৬২ টি ও বন্ধ হয়েছে ৩৬৫ টি টিউবওয়েল, মোহনপুর ইউনিয়নে মোট ৫৮৬ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ২০৭ টি ও বন্ধ হয়েছে ৩৭৯ টি টিউবওয়েল, পাকড়ি ইউনিয়নে মোট ৪২১ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ১০৯ টি ও বন্ধ হয়েছে ২৩১ টি টিউবওয়েল, রিশিকুল ইউনিয়নে মোট ৫৬৩ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ১৫৯ টি ও বন্ধ হয়েছে ৪০৪টি টিউবওয়েল, গোগ্রাম ইউনিয়নে মোট ৬৫৪ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ২০১ টি ও বন্ধ হয়েছে ৪৫৩ টি টিউবওয়েল, মাটিকাটা ইউনিয়নে মোট ৭৯৬ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ১৯৭ টি ও বন্ধ হয়েছে ৫৯৯ টি টিউবওয়েল, দেওপাড়া ইউনিয়নে মোট ৬৬৪টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ১৯২টি ও বন্ধ হয়েছে ৪৭২টি টিউবওয়েল, বাসুদেবপুর ইউনিয়নে মোট ৫৪৬ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ১৪৫ টি ও বন্ধ হয়েছে ৪০১টি টিউবওয়েল, চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে মোট ৩০৫টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ৬০টি ও বন্ধ হয়েছে ২৪৫টি টিউবওয়েল, গোদাগাড়ী পৌরসভায় মোট ৪টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ৪টি। মোট ৫,১৬৬ টি টিউবওয়েলের মধ্যে চালু রয়েছে ১,৬১৭ টি ও বন্ধ হয়েছে ৩,৫৪৯ টি টিউবওয়েল।
সুত্রটি আরো জানায় এ উপজেলায় ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরে গিয়ে বালু ও ১১৫ থেকে ১২০ ফুট গভিরে গিয়ে পাথর পাওয়া যায়। তবে মোহনপুর ইউপির সরদল এলাকায় ১৮০ ফুট, মাটিকাটা ইউপির কাদিপুর এরাকায় ১৩০ ফুট গভিরে গিয়ে ভালো বুলু পাওয়া যায়। ২৫০ ফুট গভীরে যাওয়ার পর ভালো বালু পাওয়া যায় না। সিমেন্টের মত চিটা কাদা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে সেচের জন্য যে পানি ব্যবহার হয় তার ৭৫ শতাংশই মাটির নিচ থেকে তোলা। এক কেজি বোরো ধান উৎপাদন করতে প্রায় তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। গম ও ভুট্টায় প্রতি কেজি উৎপাদনে প্রায় ৪০০-৬০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এক বিঘা বোরো ধান চাষে প্রয়োজন হচ্ছে ২৪ লাখ লিটার পানি।
এ উপজেলায় ফসল উৎপাদনে বিএমডিএ’র গভীর নলকুপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন হচ্ছে। সাধারণ টিউবওয়েল পানির যে স্তরে বসানো আছে বিএমডিএ’র গভীর নলকুপও একই স্তরে বসানো আছে। এর প্রভাবে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে বলে গবেষকরা মনে করছে।
গবেষকরা বলছে, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শুধু টিউবওয়েলের ক্ষতি হচ্ছে না, পানির স্তর নিচে নেমে গেলে নিচে বালু, পাথর ফাঁকা হয়ে পড়বে। তখন সামান্য ভূমিকম্প হলেই দেবে যেতে পারে বিশাল এলাকা। বরেন্দ্র অঞ্চলকে বাঁচাতে হলে পানির কোনও বিকল্প না। ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচ কাজে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বৃষ্টির পানি বেশি বেশি রিচার্জ করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর-খাড়ি বেশি করে খনন করতে হবে। বাসা বাড়ির ছাদের পানি মাটির নিচে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে টিউবওয়েল গুলোতে পানি না উঠায় পানির চাহিদা মেটানোর জন্য সাবমার্সিবল পাম্পের দিকে ঝুকছে এ অঞ্চলের মানুষ। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় ১ হাজার ৩১৩ টি সাবমার্সিবল পাম্প রয়েছে। এ সুত্রের বাইরেও ব্যাক্তিগত ভাবে আরো সাবমার্সিবল পাম্প রয়েছে।
এদিকে বিএমডিএ’র গভীর নলকুপ বসানোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যাক্তিগত ভাবে বসানো হচ্ছে সাবমার্সিবল পাম্প। টিউবওয়েল বা সাবমার্সিবল পাম্প বসানোর জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। এই কমেটি অনুমোদন দিলেই টিউবওয়েল বা সাবমার্সিবল পাম্প বসাতে পারবে কোন ব্যাক্তি। তাছাড়া নয়। সাবমার্সিবল পাম্প বসানোর ক্ষেত্রেও আইন রয়েছে ১৫০ ফিটের মধ্যে কেউ সাবমার্সিবল পাম্প বসাতে পারবেনা। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের এই অনুমোদনকে (আইনকে) বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বসানো হচ্ছে সাবমার্সিবল পাম্প গুলো। ফলে বন্ধ হচ্ছে না ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন।
যে কয়েকটি টিউবওয়েল চালু আছে পানির স্তর না থাকার কারণে মেরামতের কিছুদিন পর তা পুনরায় অচল হয়ে পড়ে আবার মেরামত করে সচল করতে হয়। লেগেই থাকে মেরামতের কাজ।
গোদাগাড়ী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী শাহীনুল হক বলেন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ফলে ভূ-গর্ভস্থে পানি রিচার্জ হচ্ছে না যার ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানি না পাওয়ায় টিউবওয়েল গুলো অকেজো হয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে গাছপালা লাগানো প্রয়োজন যাতে করে বৃষ্টিপাত বেশী হয়। বৃষ্টিপাত বেশী হলো ভূ-গর্ভস্থে পানি রিচার্জ হবে, এতে করে পরিত্রান পাওয়া যাবে।


প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২২ | সময়: ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ