ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সবজি বাজারে

স্টাফ রিপোর্টার: সারা দেশের মত রাজশাহীর সবজিরও দাম বেড়েছে। এসব সবজি ভোক্তা পর্যায়ে পৌছাতে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে দাম। পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধিতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটে নিত্যপণ্যের দামে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি একটি বড় দুঃসংবাদ।
নিত্য দ্রব্যের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ঘরে বাইরে একটায় আলোচনা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। সবজি থেকে শুরু করে সব ধরণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যের দাম বেড়েছে। ক্রেতারা বাজারে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। দুশ্চিন্তায় পড়েছে নিম্নমধ্যবৃত্ত ও মধ্যবৃত্ত শ্রেণির মানুষ। এককথায় জ্বালানি জ্বরে ভুগছে দেশ।
বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিখাতসহ ভাড়া বৃদ্ধিতে সবজির দাম বাড়ছে বিভিন্ন মোকামে। যার প্রভাব পড়ছে ক্রেতার ওপর। রাজশাহী থেকে সরবরাহকৃত মাছ ও সবজির বেশী দাম গুনতে হচ্ছে ঢাকা-চট্টোগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। আবার একই কারণে রাজশাহীতেও বাড়ছে অন্য জেলা থেকে আমদানিকৃত সকল পন্যের দাম। এমনকি একই জেলার মধ্যেও এই কারণেই কাঁচা সবজিরও দাম বেড়েছে।
চাষিরা বলছেন ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষি এখন কঠিন অবস্থায় পড়ছে। তারা মনে করছেন কৃষিপ্রধান এই দেশে ডিজেলের দামবৃদ্ধি ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। সেচের পেছনে আরও ৫০ শতাংশ খরচ বৃদ্ধি পাবে জানিয়ে কৃষক বলছেন, এমনিতেই কৃষকের মূলধনের সংকট, তার ওপর হঠাৎ জ্বালানি তেলের একসঙ্গে এত বেশি দাম বাড়ার ধাক্কা সামলানো তাদের জন্য কষ্টসাধ্য।
সচেতনমহল জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে নতুন করে বাস, লঞ্চ ও ট্রাকভাড়া বেড়েছে। বাজারে এখন চাল, ডাল, তেল, চিনি, সাবান, টুথপেস্টসহ প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেশি। গত মে মাসের পর ডলারের দাম ৮৬ থেকে ১০৮ টাকায় উঠে যাওয়ায় আমদানি করা সব পণ্যের দাম বাড়ছে। এমন অবস্থায় দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে বড় সংকটে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন। দাম বাড়িয়ে ঘাটতি সমন্বয় করতে গিয়ে জনগণের ওপরের যে আঘাত হানা হয়েছে, তা সিডর-আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়কে হার মানায়।
পবার চরমাঝারদিয়াড় চরের কৃষক শামীম হোসেন জানান, আগে শ্যালোমেশিনে এক ঘণ্টা সেচ দিতে ১০০ টাকা লাগলেও এখন এর পেছনে ব্যয় হবে ১৫০ টাকা। নিশ্চিতভাবে এই দাম বাড়ার বড় একটা প্রভাব পড়বে উৎপাদন ব্যয়ে। শেষমেশ চালের বাজারে গিয়ে ঠেকবে এর প্রভাব।
এদিকে জ্বালানি তেলের প্রভাব পড়েছে সবজিতে। পাইকারি বাজারে সাতদিনের ব্যবধানে সবজির দাম বেড়েছে। যা ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত। এরপরেই বেড়েছে পরিবহন ভাড়া। এক্ষেত্রে পরিবহনের জন্যই প্রায় প্রতিকেজি সবজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত।
রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার বিদিরপুর হচ্ছে সবজির বড় পাইকারি বাজার। বুধবার ও রোববার এখান থেকে দেশের বিভিন্ন মোকামে ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক সবজি যায়। এছাড়াও প্রতিদিন পবার খড়খড়ি থেকেও ২০ থেকে ৩০ ট্রাক সবজি ও কাঁচা মরিচ যায় বিভিন্ন মোকামে। বুধবার এই দুই বাজারে সরজমিন দেখা যায়, গত সপ্তাহ থেকে গতকাল প্রতিটি সবজির দাম বেড়েছে। অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে বেগুনের দাম। এরপরেও রয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাড়তি ভাড়া।
পাইকারি ব্যবসায়ী আতাউর রহমান, আসাদুল ইসলাম, জামাল হোসেন, হামদুল ও আনারুল বলেন, বর্তমানে প্রতিটি সবজির দাম বেড়েছে। এরপরেও রয়েছে ভাড়া বৃদ্ধি। তারা জানান, গত সপ্তাহের সাড়ে তিনশো থেকে সাড়ে চারশো টাকা মণের পটল আজকে কিনতে হয়েছে নয়শো’ থেকে এক হাজার টাকা। এ ছাড়াও বড় করলা প্রতি মণ ১২শো’ থেকে ১৩শো টাকা, ক্ষুদি করলা ১৮শো’ থেকে ১৯শো’ টাকা। গত সপ্তাহে প্রতিমণ বেগুন ছিল ১৬শো’ থেকে ১৮শো’ টাকা। বর্তমানে ২৪শো’ থেকে ২৫শো’ টাকা। প্রতিকেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয় ২২০ টাকা।
তারা জানান, একেতো সবজির দাম বেশী। এর ওপর ভাড়াও লাগছে অনেক বেশী। জ্বালঅনি তেলের দাম বৃদ্ধির আগে রাজশাহী থেকে ঢাকা কারওয়ান বাজারে সবজিভর্তি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে গিয়ে হয়েছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। যে কারণেও মোকামে সবজির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর খুচরা পর্যায়ে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে ডিজেলের দাম ১১৪ টাকা লিটার, যা এত দিন ৮০ টাকা ছিল। পেট্রোলের নতুন দাম ১৩০ টাকা, যা এতদিন ৮৬ টাকা ছিল। অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটারে ৪৬ টাকা। এত দিন অকটেন ৮৯ টাকা লিটার বিক্রি হতো। এখন তা ১৩৫ টাকায় বিক্রি কিনতে হচ্ছে।
আবার রাজশাহীর তৃণমুলে কয়েকদিনের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা। আবার আটা ময়দার দামও বেশী। বিক্রেতাও তেলের দাম বৃদ্ধির কথায় বলছেন। পবার পারিলার রামচন্দ্রপুর হাট এলাকার মোতলেবুর রহমান বলেন, স্থানীয় বাজারে চালের দাম হুহু করে বাড়ছে। বিভিন্ন মিলের ৫০ কেজির গুটি স্বর্ণা চালের দাম ছিলো ২২শো টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২৪ শো’ টাকা। তিনি বলেন তেলের দাম বৃদ্ধিতে এতটা বাড়ার কথা নয়। বাজার তদারকিতে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যে যার মতো দাম হাঁকাচ্ছেন। এতে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
রাজশাহী জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সাদরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই পন্যবাহি ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে। তিনি বলেন রাজশাহী থেকে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার পন্যবাহি ট্রাক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে যায়। দাম বাড়ার আগে রাজশাহী থেকে পন্য নিয়ে ঢাকার ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২০-২২ হাজার টাকা। তিনি বলেন, যেভাবে প্রতি কি.মি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সেভাবে পন্যবাহি ট্রাকের ভাড়াও নির্ধারণ করা দরকার। এব্যাপারে মূল্য নির্ধারণ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।


প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২২ | সময়: ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ